অর্থনৈতিক গতিপথ
পুনরুদ্ধার সংস্কার ও অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সন্ধিক্ষণে। ২০২২-২৪ মেয়াদে বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সঙ্কট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ধাক্কা সামলে দেশ এখন প্রবেশ করছে এক নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়া অর্থনীতিতে একদিকে যেমন স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে রেখে গেছে কাঠামোগত দুর্বলতার গভীর চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সাল তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আর্থিক বছর নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণের বছর।
প্রবৃদ্ধি : সংখ্যার পুনরুদ্ধার, গুণগত প্রশ্ন : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে পারে- এমন পূর্বাভাস দিচ্ছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসা, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়া এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি এ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক?
গত এক দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আড়ালে যে অসমতা, ঋণনির্ভরতা ও উৎপাদনশীলতার ঘাটতি জমে উঠেছিল, ২০২৬ সালেও তার পূর্ণ সমাধান হয়নি। অবকাঠামো ও ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধির বদলে শিল্প বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন- এই তিন খাতে অগ্রগতি না হলে প্রবৃদ্ধি সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় : ২০২৬ সালে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের জায়গা হলো মূল্যস্ফীতি। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যদিও ২০২৪-২৫ সালের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে, তবুও নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রকৃত আয় এখনো চাপের মধ্যে।
জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, ভর্তুকি কমানো এবং বাজারমুখী বিনিময় হার- এই সংস্কারগুলো অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও স্বল্পমেয়াদে জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালে সরকার যদি লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে না পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বৈদেশিক খাত : রেমিট্যান্স ও রফতানির দ্বৈত বাস্তবতা : বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বৈদেশিক খাত। ২০২৬ সালে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও তা এখনো প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ ও প্রণোদনা নীতির কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
রফতানি খাতে তৈরি পোশাক শিল্প এখনো প্রধান চালিকাশক্তি। তবে বৈশ্বিক চাহিদা, সবুজ উৎপাদন, শ্রম অধিকার ও এলডিসি-উত্তর শুল্ক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা ২০২৬ সাল থেকেই প্রকট হচ্ছে। পোশাকের বাইরে ওষুধ, আইটি, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাত প্রসারে গতি না এলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত : সংস্কারের পরীক্ষাকাল : ২০২৬ সাল ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি পরীক্ষার বছর। খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনো বড় সমস্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ এখনো সীমিত।
ডলার সঙ্কট, সুদের হার উদারীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা- এই তিন প্রশ্নে ২০২৬ সালে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে বিনিয়োগ আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না। দেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আইনের শাসন ও নীতিগত ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি ঋণ ও বাজেট চাপ : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ছে, একই সাথে অভ্যন্তরীণ ঋণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধ ও সুদে।
এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত সংস্কার- বিশেষ করে করজালের সম্প্রসারণ, সম্পদ কর এবং ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে উঠেছে। নচেৎ উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কুচিত হয়ে অর্থনীতি আবারো স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রাজনীতি ও অর্থনীতির সংযোগ : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি রাজনীতির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রূপান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা রাজনৈতিক নিশ্চয়তার ওপরই নির্ভর করে।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় দেখিয়েছে- জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না। ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সামাজিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে নেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সুযোগ পেতে পারে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথ কোনো একমুখী সরল রেখা নয়। এটি একদিকে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে পুরনো দুর্বলতার ভার বহন করছে। প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু চাপও আছে; সংস্কার আছে, কিন্তু প্রতিরোধও আছে। এই বছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি কেবল সঙ্কট সামলে টিকে থাকবে, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে?
উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনগণের সাথে অর্থনীতির নতুন সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলার ওপর। ২০২৬ সাল তাই শুধু একটি বছর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মোড়।