গাজায় নতুন বছর শুরু হতাশা আর সংগ্রামে
Printed Edition
- ফিলিস্তিনি বন্দীদের পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করত ইসরাইল
- ফিলিস্তিনের সমর্থনে সুইডেনে নববর্ষ উদযাপন বাতিল
- ইস্তাম্বুলে ফিলিস্তিনের সমর্থনে লাখো মানুষের মিছিল
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দীর্ঘ যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতে কান্ত গাজাবাসী নতুন বছরেও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনের জীবনে তাদের সংগ্রাম যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। অবরুদ্ধ এই উপত্যকার সাধারণ মানুষ ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। নতুন বছরের শুরুতে আনন্দের কোনো ছোঁয়া নেই তাদের জীবনে। আছে শুধু হতাশা আর বিষাদ। এমনই এক বাস্তুচ্যুত নারী সানা ইসরা, যিনি প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত।
আলজাজিরার এক বিশ্লেষণী রিপোর্টে বলা হয়, সাদা প্লাস্টিকের তেরপলিন দিয়ে তৈরি তাঁবুতে সানা ইসা তার মেয়েদের সাথে বসেছিলেন। নতুন বছর এবং গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর নিয়ে সানা আলজাজিরার সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু বৃষ্টিতে তাঁবুতে ভেজা কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা সানার কাছে ইতিবাচক হওয়ার মতো তেমন কোনো বিষয় এখন আসলে নেই। গাজা উপত্যকায় তিনি এবং তার মতো অন্যান্য বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের যে কঠিন বছরের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তার বর্ণনা দিয়ে সানা আলজাজিরাকে বলেন, আমরা যুদ্ধ, ঠাণ্ডা, নাকি ক্ষুধাকে দোষ দেবো তা বুঝতে পারছি না। আমরা এক সঙ্কট থেকে অন্য সঙ্কটে চলে যাচ্ছি।
মানবিক অবস্থার অবনতির মধ্যে গাজার ফিলিস্তিনিদের একসময়ের উচ্চাকাক্সী আশা, উন্নত ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনের স্বপ্ন, হারিয়ে গেছে। এর বদলে জায়গা করে নিয়েছে মৌলিক মানবিক চাহিদা- আটা, খাবার এবং বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা, ঠাণ্ডা থেকে রা করার জন্য তাঁবু সংগ্রহ করা, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা এবং বোমাবর্ষণ থেকে বেঁচে থাকা। সানার মতো ফিলিস্তিনিদের জন্য, নতুন বছরের আশা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। ৪১ বছর বয়সী সানা সাত সন্তানের জননী। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার প্রথম বছরের শেষে ইসরাইলি হামলায় তার স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে তিনি তার সন্তানদের লালন-পালনের একমাত্র দায়িত্বে ছিলেন।
সানা তার পরিবারের সাথে আল-বুরেইজ থেকে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় পালিয়ে আসেন। শিশুদের প্রতি দায়িত্ব, স্থানচ্যুতি, খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা, এখানে-সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া সবকিছুই তার কাছে ছিল বেশ কঠিন বিষয়। ২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘একটি রুটি’ জোগাড় করা এবং তার পরিবারের জন্য প্রতিদিন এক কেজি আটা জোগাড় করা। তিনি তিক্ত স্বরে বলেন, দুর্ভিরে সময় আমি একটাই ইচ্ছা নিয়ে ঘুমাতাম এবং জেগে উঠতাম, সেটা হলো দিনের জন্য পর্যাপ্ত রুটি জোগাড় করা। যখন আমার বাচ্চারা আমার সামনে অনাহারে ছিল, আর আমি কিছুই করতে পারছিলাম না আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি। আটার সন্ধানে অবশেষে সানা গাজাজুড়ে মে মাসের শেষের দিকে খোলা মার্কিন-সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, প্রথমে আমি ভীত এবং দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, কিন্তু আমরা যে ক্ষুধার মধ্য দিয়ে বাস করছি তা আপনাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করতে পারে, যা আপনি কখনো কল্পনাও করেননি। কিন্তু সাইটগুলোতে যাওয়া কেবল সানার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না, এটি এমন একটি পথ ছিল যা তার মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল এবং স্থায়ী ত রেখে গিয়েছিল। গাজায় যুদ্ধের ফলে খাদ্য ও মানবিক সহায়তায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। গত বছরের মার্চের শেষের দিকে এই পরিস্থিতি শুরু হয় এবং জাতিসঙ্ঘ আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভি পরিস্থিতি ঘোষণা করে, যা অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যদিও যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে তবে সঙ্কট একেবারে শেষ হয়নি। গাজার কিছু অংশে খাদ্য সঙ্কট ভয়াবহ পর্যায়ে প্রবেশ করায় খাদ্য, পানি এবং ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেড়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করত ইসরাইল
ইসরাইলি কারা কর্তৃপ গাজায় চলমান যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি বন্দীদের পানীয়জল থেকে বঞ্চিত করেছে বলে নতুন এক রিপোর্টে উঠে এসেছে। বুধবার প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়, বন্দীদের কখনো কয়েক ঘণ্টা, আবার কখনো টানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা ছিল সম্মিলিত শাস্তির অংশ। খবর আনাদোলুর।
ইসরাইলের বিচার মন্ত্রণালয়ের পাবলিক ডিফেন্ডার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে। হারেৎজ পত্রিকা জানিয়েছে, বন্দীদের পানির প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছিল বিশেষ করে দণি ইসরাইলের কেতজিওত কারাগারের কিছু অংশে। মে, জুন ও সেপ্টেম্বরে তিন দফা পরিদর্শনে এ তথ্য উঠে আসে। সেপ্টেম্বরে গিয়ে দেখা যায়, এ নীতি বন্ধ করা হয়েছে। প্রথম দুই পরিদর্শনে বন্দীদের দিনের কিছু সময় পানির প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। কখনো এটি সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে, আবার কখনো নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কার্যকর করা হয়। তবে ইসরাইলি কারা কর্তৃপ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, বন্দীদের বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত করা বা সম্মিলিত শাস্তি দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। হারেৎজের আগের খবরে বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনি বন্দীদের অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। নভেম্বর মাসে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বন্দীরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে এবং আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাদের ন্যূনতম খাবার দেয়া হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, কারা কর্তৃপ নিরাপত্তা বন্দীদের মৌলিক জীবনযাপনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার না দেয়ায় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে সুইডেনে নববর্ষ উদযাপন বাতিল
সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে শত শত মানুষ নববর্ষের আনন্দ অনুষ্ঠান বাতিল করে গাজার মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে বিােভে অংশ নেন। গত বুধবার রাতে তীব্র শীত উপো করে তারা সেগেলস টর্গ স্কয়ারে জড়ো হন। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের আহ্বানে আয়োজিত এ সমাবেশে অংশ নিয়ে তারা নববর্ষ উদযাপনের পরিবর্তে ইসরাইলি হামলায় নিহত শিশু ও সাধারণ মানুষের জন্য শোক প্রকাশ করেন। খবর আনাদোলুর।
বিােভকারীরা হাতে ব্যানার বহন করেন, যেখানে লেখা ছিল- ‘গাজায় শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে’, ‘স্কুল ও হাসপাতাল বোমায় ধ্বংস করা হচ্ছে’, ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি মানতে হবে’ এবং ‘খাদ্য সঙ্কট বন্ধ করো’। তারা ইসরাইলের গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবি জানান এবং সুইডেনকে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানান। আয়োজকদের প থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন বছরে আমরা ফিলিস্তিনে গণহত্যা, অবরোধ এবং এ বিষয়ে নীরবতা প্রত্যাখ্যান করছি। অন্যায়কে উপো করে আমরা নতুন বছর শুরু করতে চাই না।
ইস্তাম্বুলে ফিলিস্তিনের সমর্থনে লাখো মানুষের মিছিল
ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানাতে ইস্তাম্বুলের গালাতা সেতুতে জড়ো হন সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ। নববর্ষের প্রথম দিনে ৩০৮টি সংগঠনের জোট ‘ন্যাশনাল উইল প্ল্যাটফর্ম’ এ সমাবেশের আয়োজন করে। আনাদোলু নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ঐতিহাসিক শহর এবং আশপাশের মসজিদগুলো থেকে ফজরের নামাজের পর শীতের কুয়াশা ভেদ করে তুর্কি ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে মিছিলে নামেন সমাবেশে আগতরা। চলমান নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদেেপর দাবিতে আইকনিক গোল্ডেন হর্নজুড়ে বিস্তৃত সেতুতে জড়ো হওয়ার আগে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুসহ বিােভকারীরা ফিলিস্তিনে ইসরাইলি গণহত্যা বন্ধের জন্য দোয়া করেন।
সেতুর মাঝখানে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। সেখানে তুর্কি ও ফিলিস্তিনি পতাকার সাথে তুর্কি ও ইংরেজিতে ‘গাজায় গণহত্যা বন্ধ কর’ লেখা একটি বিশাল ব্যানারও দেখা গেছে। সমাবেশস্থলের পাশে সমুদ্রে নৌকার লোকজনও বিােভকে সমর্থন জানিয়ে হাত নাড়েন। এ ছাড়া প্রেসের জন্য ব্যবস্থা করা একটি প্ল্যাটফর্মে ‘ফর ফেয়ার ফিউচার’ ব্যানার দেখা যায়। অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন তুর্কি নাগরিক, বিদেশী সংগঠনের সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মীরা বক্তব্য দেন। সমাবেশে একটি তুর্কি ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বিলাল এরদোগান গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান। তিনি শিশু, শিশু, নারী, বৃদ্ধ, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের হত্যার পাশাপাশি স্কুল, মসজিদ ও গির্জায় ইসরাইলের হত্যার কথা স্মরণ করেন। গাজায় পশ্চিমাদের ‘মুখোশ’ খসে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথায় মানবাধিকার? শিশু অধিকার কোথায়? নারীর অধিকার কোথায়? কোথায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা? গাজা ও পাশ্চাত্যের সব মূল্যবোধ মরে গেছে।