সঙ্কট সংস্কার ও রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে গ্যাস-বিদ্যুৎ খাত
ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে বের হওয়া যায়নি
Printed Edition
আশরাফুল ইসলাম
২০২৫ সাল বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতকে আর কোনো রাখঢাক ছাড়াই কাঠামোগত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের ভুল জ্বালানি পরিকল্পনা, স্বল্পমেয়াদি আমদানি নির্ভরতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তনির্ভর প্রকল্প অনুমোদনের ফলাফল এই বছর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাগুজে সক্ষমতা থাকলেও বাস্তব জ্বালানি সঙ্কট, আর্থিক চাপ ও দক্ষতার অভাব খাতটিকে একধরনের নীতিগত স্থবিরতায় ঠেলে দেয়। আর এ কারণে বছরজুড়ে এই খাত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়।
গ্যাস খাত : উৎপাদন স্থবির, আমদানিনির্ভরতা তীব্র
২০২৫ সালে দেশের গ্যাসসঙ্কট আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ব্যর্থতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বিদায় বছরে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বড় ধরনের অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। অনশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে নতুন আবিষ্কারের অভাব, পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং অনুসন্ধান কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা সঙ্কটকে আরো প্রকট করেছে। দৈনিক চাহিদা যেখানে ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি, সেখানে দেশীয় উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ২৩০ কোটি থেকে ২৪০ কোটি ঘনফুটে।
এই ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা আরো বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট কিছুটা কমলেও এলএনজির উচ্চ মূল্য ও ডলার ব্যয়ের কারণে সরকার ও পেট্রোবাংলাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। স্পট মার্কেট থেকে আমদানি সীমিত রেখে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়। তবুও শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহে ঘন ঘন রেশনিং অব্যাহত থাকে।
শিল্প ও সার উৎপাদনে প্রভাব
গ্যাসসঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পখাতে। টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ ও ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল ও বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং রফতানির প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সাথে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় ইউরিয়া উৎপাদন হ্রাস পায়, যার ফলে সরকারকে আমদানির ওপর আরো নির্ভরশীল হতে হয়।
বিদ্যুৎ খাত : সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কমিশন বাণিজ্যের জন্য শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য যে প্রাথমিক জ্বালানি প্রয়োজন তার কোনো সংস্থান করা হয়নি। আর এ কারণে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় বৈপরীত্য ছিল উৎপাদন সক্ষমতা পর্যাপ্ত, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত। বছর শেষে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছালেও বাস্তবে গড়ে উৎপাদন অনেক কম ছিল। গ্যাস ও কয়লার সঙ্কটের কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়।
কয়লাভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলো বিশেষ করে পায়রা জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও কয়লা আমদানির বিল পরিশোধে ডলারসঙ্কট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একই সাথে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার উৎপাদন সীমিত রাখে।
ক্যাপাসিটি চার্জ ও আর্থিক চাপ
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পতিত সরকারের দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতকে এমন এক চক্রাকার জটিল বৃত্তের মধ্যে ফেলেছিল, যা থেকে শিগগিরই বের হওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ মূল্যের ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসরকারি ও বিদেশী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথেই চুক্তিই করা হয়েছিল অসম। যেমন- বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ নিতে না পারলে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ ২০২৫ সালেও বড় ইস্যু হিসেবে রয়ে যায়। উৎপাদন না করলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিশাল অঙ্কের লোকসানে পড়ে। সরকারের ভর্তুকি বাড়ে, যা সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতায় সরকার ধীরে ধীরে নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটে। নতুন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন কার্যত বন্ধ রাখা হয় এবং বিদ্যমান চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা শুরু হয়।
কয়লা ও আমদানিনির্ভরতা : নতুন ঝুঁকি
২০২৫ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কয়লা আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপে কয়লা আমদানি বিল সময়মতো পরিশোধে জটিলতা দেখা দেয়, যা সরবরাহ স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে। এতে স্পষ্ট হয়, শুধু গ্যাস থেকে সরে এসে কয়লায় ঝুঁকলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; বরং আমদানি নির্ভরতা অন্য রূপে ফিরে আসে।
সমুদ্রগ্যাস ও অনুসন্ধান : আশায় অনিশ্চয়তা
বছরজুড়ে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা চললেও দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন ও নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। তবে বাস্তব অনুসন্ধান ও আবিষ্কার এখনো ভবিষ্যতের বিষয় হয়েই থাকে।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতকে একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনা, আমদানিনির্ভরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সাথে এ বছরটি ভবিষ্যৎ সংস্কার ও জ্বালানি বৈচিত্র্যের দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে সামনে এনেছে। সঙ্কটের মধ্য দিয়েই ২০২৫ সাল শেখায়, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় অনুসন্ধান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী নীতিই হতে হবে বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের মূল পথনির্দেশক।