কোটি টাকা গিলে খাচ্ছে কালো তালিকার ৪ প্রেস
Printed Edition
শাহেদ মতিউর রহমান
নতুন বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণে এবারো ঘটেছে বিপত্তি। প্রাথমিকের শতভাগ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হলেও মাধ্যমিকে অর্ধেকের বেশি বই এখনো ছাপার কাজই শেষ হয়নি। এ ছাড়া বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জন্য নিম্নমানের পাঠ্যবই মুদ্রণেও কোটি কোটি টাকা গিলে খাচ্ছে কালো তালিকাভুক্ত একাধিক প্রেস মালিক। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তদন্তেও নিম্নমানের বই ছাপার সত্যতা মিলেছে। শিগগিরই অভিযুক্ত প্রেসের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আগামী বছরগুলোতে বই ছাপার কাজে যুক্ত না করার বিষয়ে এসব প্রেসকে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। ভিন্ন নামেও এসব প্রেস আগামী দিনে এনসিটিবির বই মুদ্রণের কাজে অংশ নিতে পারবে না। সম্প্রতি শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার জানিয়েছেন, বিগত বছরে যা হওয়ার হয়েছে। চলতি বছরে আমরা নিম্নমানের কোনো বই গ্রহণ করব না। বইয়ের মানের বিষয়ে ন্যূনতম কোনো ছাড় দেয়া হবে না।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাধ্যমিকের বিনামূল্যের বই মুদ্রণে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ভিন্ন ভিন্ন প্রেস থেকে নিম্নমানের বই মুদ্রণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাথমিকের বই মুদ্রণেও নাহার প্রেস নামে একটি প্রেস থেকে নিম্নমানের কাগজে ছাপার অভিযোগ এসেছে। মাধ্যমিকের বই মুদ্রণে একই পরিবারের চার প্রেসের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পেয়েছে খোদ এনসিটিবি। সূত্র জানায়, মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণীর বিষয়ভিত্তিক একাধিক লটের বিপুলসংখ্যক বই মুদ্রণের কাজ পেয়েছে কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস নামে দু’টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এ দু’টি প্রেস পাঠ্যবই ছাপাতে সাড়ে ৮ হাজার টন কাগজ ব্যবহার করছে। এরমধ্যে সাড়ে ৫ হাজার টন কাগজ ইতোমধ্যে ব্যবহার করে পাঠ্যবই ছাপিয়েছে প্রতিষ্ঠান দু’টি। তবে পাঠ্যবই ছাপাতে প্রেস দু’টি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ নিম্নমানের (৩৮৫০ টন) রিসাইকেল কাগজ ব্যবহার করেছে। সূত্রের তথ্য, ভালো মানের একটন কাগজের দাম বাজারে ১ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু প্রেস দু’টি যে নিম্নমানের রিসাইকেল কাগজ ব্যবহার করছে; সেটার দাম বাজারে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা অর্থাৎ টনপ্রতি পার্থক্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এতে সরকার থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে অভিযুক্ত এই প্রেসগুলো।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের নতুন শিাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকপর্যায়ে শিার্থীদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩০ কোটির অধিক বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করবে সরকার। এসব পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করছে ১০৪টি বেসরকারি প্রেস (মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান); যার মধ্যে শুরু থেকেই কয়েকটি প্রেসের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, কর্ণফুলী ও অগ্রণী নামের এই প্রতিষ্ঠান থেকে ছাপানো ৫০ লাখ ফর্মা এবং নিম্নমানের রিসাইকেলকৃত কাগজে বই ছাপানোর কারণে সম্প্রতি বাইন্ডিং, কাটিং ও সরবরাহ স্থগিত করেছে তদারক প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি। শুধু তাই নয়, ছাপা হওয়া নিম্নমানের এসব বই ও ফর্মা ধ্বংস করার নির্দেশও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে, চিহ্নিত এই চারটি প্রেসের কাছে জিম্মী এনসিটিবি। যার ফলে বদলির ভয়ে মুখ খোলেন না অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। অন্য দিকে প্রেস পরিদর্শনে যাওয়া কর্মকর্তাদের বড় অফার দিয়ে থাকেন অভিযুক্ত প্রেসগুলোর মালিকরা। তাতে রাজি না হলে হুমকিও দিয়ে থাকেন তারা। এই অনিয়মে জড়িত ত্রিমুখী সিন্ডিকেট, যার মধ্যে রয়েছে এনসিটিবির এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন অফিসে কর্মরত আরো একটি গ্রুপ। তারা এসব অনিয়ম প্রকাশ করতে দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, অগ্রণী প্রেসের মালিক কাউসার-উজ-জামান রুবেল ও কর্ণফুলী প্রেসের মালিক হাসান-উজ-জামান রবিন আপন দুই ভাই। আওয়ামী আমলের সাবেক শিামন্ত্রী দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সাথে আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে তারা এনসিটিবির মোটা অঙ্কের কাজ বাগিয়ে নিয়েছে তারা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও তারা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে এনসিটিবির বড় লটের কাজ পাচ্ছে। এ বিষয়ে অগ্রণী প্রেসের মালিক কাউসার-উজ-জামান রুবেল নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের প্রেসে কিছু কাগজ নিয়ে এনসিটিবির আপত্তি ছিল। আমরা সেই কাগজ সরিয়ে নিয়েছি। কিছু বইয়ে ত্রুটি ছিল। বইগুলো গত সপ্তাহে কেটে ফেলা (নষ্ট করা) হয়েছে। নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কম দামে কাগজ কেনার বিষয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে এটা সঠিক নয়। কেননা ৭০-৭৫ হাজার টাকায় এখন নিউজপ্রিন্টও বাজারে পাওয়া যায় না। আমরা চেষ্টা করছি ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করতে। তবে তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন কিছু কাগজ মিলমালিক পরিকল্পিতভাবে আমাদের প্রেসের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রচার করছে। আওয়ামী আমলে (২০০৮ সালে থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত) তাদের প্রেসগুলো এনসিটিবির কোনো কাজ করতে পারেনি বলেও তিনি জানান। সূত্র আরো জানায়, ২০২৬ শিাবর্ষে মোট বইয়ের ১৩.৫৫ শতাংশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ পেয়েছে একই পরিবারের মালিকানাধীন নোয়াখালীতে অবস্থিত কর্ণফুলী আর্ট প্রেস ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস এবং কেরানীগঞ্জে অবস্থিত আনোয়ার প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিকেশন ও কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন। এর মধ্যে প্রথম দু’টির মালিক আপন দুই ভাই এবং অন্য দুটির একজন তাদের বোন জামাই ও ভাগ্নে।
এনসিটিবি বিনামূল্যের বইয়ের মান যাচাই ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বেসরকারি ইন্সপেকশন এজেন্সি বিডি কন্ট্রোল এজেন্সি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) রাফি মোহাম্মদ বিপ্লব জানান কর্ণফুলী ও অগ্রণী প্রেস দু’টিতে যে অনিয়ম পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে এনসিটিবিকে অফিসিয়াললি জানানো হয়েছে। এই অনিয়মের বিষয়ে এখন এনসিটিবি পদপে নেবে। এ ছাড়াও কর্ণফুলীতে নিম্নমানের রিসাইকেল কাগজের যে ৫০ লাখ ফর্মা পাওয়া গেছে তা ধ্বংস করা হয়েছে।