কিভাবে অদক্ষতা দশকের পর দশক টিকে থাকল

বিদ্যুৎ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক দখল ও জবাবদিহিতার ভাঙন

দেশের বিদ্যুৎ খাতে উচ্চমূল্য, অতিরিক্ত সক্ষমতা ও বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এগুলো টিকে আছে দীর্ঘ সময় ধরে, এমনকি সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পরও। কেন এই অদক্ষতা সংশোধন হয়নি? কেন ব্যয়বহুল চুক্তি ও অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা বহাল থেকেছে বছরের পর বছর?

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
Electricity

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে উচ্চমূল্য, অতিরিক্ত সক্ষমতা ও বাড়তে থাকা আর্থিক চাপ কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এগুলো টিকে আছে দীর্ঘ সময় ধরে, এমনকি সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পরও। কেন এই অদক্ষতা সংশোধন হয়নি? কেন ব্যয়বহুল চুক্তি ও অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা বহাল থেকেছে বছরের পর বছর?

জাতীয় পর্যায়ের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, এর পেছনে রয়েছে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দখল (ওহংঃরঃঁঃরড়হধষ ঈধঢ়ঃঁৎব), নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ক্ষয় এবং জবাবদিহির বড় ধরনের শূন্যতা। বিশেষ করে কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (বিশেষ বিধান) আইন, কিউইইইএস-এর অধীনে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাই এই সঙ্কটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুৎপাদন করেছে।

আইনেই সুরক্ষা, জবাবদিহি দুর্বল : কিউইইইএস আইন প্রণীত হয়েছিল জরুরি বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলার জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে এই আইন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য এক ধরনের আইনি ঢাল হয়ে ওঠে।

এই আইনের আওতায়- সরকারি ক্রয় আইন থেকে অব্যাহতি, বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ সীমিতকরণ, ‘সৎ উদ্দেশ্যে নেয়া সিদ্ধান্তের’ দায়মুক্তি- এসব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে বহু বিলিয়ন ডলারের দায় সৃষ্টি হলেও পরে কার্যকর পর্যালোচনার সুযোগ প্রায় থাকেনি।

অনেক বড় বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে (পিপিএ) আবার অফশোর আরবিট্রেশন কজ যুক্ত করা হয়। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তি দেশীয় আদালত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাইরে চলে যায়। এতে বিনিয়োগকারীদের আইনি নিশ্চয়তা বাড়লেও দেশের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরো দুর্বল হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা ক্ষয় : আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মূল্য নির্ধারণ ও ভোক্তা সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। কিন্তু বাস্তবে কিউইইইএস আমলে এই কর্তৃত্ব ক্রমেই খর্ব হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশের দাম সরাসরি চুক্তিতে নির্ধারিত হওয়ায় তা আর নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনার আওতায় থাকেনি। ফলে- খরচ যৌক্তিক কি না, আন্তর্জাতিক মানের সাথে দাম সঙ্গতিপূর্ণ কি না, ঝুঁকি বণ্টন ন্যায্য কি না- এসব প্রশ্ন কার্যত নিয়ন্ত্রকের হাতের বাইরে চলে যায়। সময়ের সাথে বিইআরসি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিউইইইএস আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গেছে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে। তারা সময়ের পর সময় বিভিন্ন প্রযুক্তিতে, বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের চুক্তি ও ট্যারিফ কাঠামো পেয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ হাব। একই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একাধিক বড় প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে সীমিত কয়েকটি স্পন্সরের মাধ্যমে। কাগজে এটি ‘ভৌগোলিক কাস্টারিং’, বাস্তবে এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাভোগী প্ল্যাটফর্ম।

ফলে প্রতিযোগিতা কমে, নতুন উদ্যোক্তাদের প্রবেশ কঠিন হয় এবং একই ধরনের ব্যয়বহুল চুক্তি বারবার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। এ অবস্থায় ব্যয়ের যৌক্তিকতা বা চাহিদা পূর্বাভাস নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলার প্রণোদনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

নেই সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা

সবচেয়ে গুরুতর ঘাটতি হলো-এক্স পোস্ট ফ্যাক্টো রিভিউয়ের অনুপস্থিতি। বড় প্রকল্প অনুমোদনের পর কখনোই নিয়মিতভাবে যাচাই করা হয়নি- প্রকল্পটি প্রত্যাশিত ফল দিয়েছে কিনা, চাহিদা অনুমান ঠিক ছিল কি না, ব্যয় যৌক্তিক ছিল কি না।

ফলে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শেখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। একই ধরনের ভুল বারবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে।

সংস্কারে বাধা কেন?

এই ব্যবস্থায় লাভ ও ক্ষতির বণ্টন অসম। ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে- উচ্চ বিদ্যুৎ বিল, বাড়তি ভর্তুকি এবং অন্যান্য খাতে বাজেট সঙ্কোচনের মাধ্যমে।

কিন্তু লাভ কেন্দ্রীভূত থাকে কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিধারী গোষ্ঠীর হাতে। তারা রাজনৈতিক ও আইনি দিক থেকে শক্ত অবস্থানে থাকায় সংস্কারের বিরোধিতা করতে সম।

২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বহু এলওআই বাতিলের সিদ্ধান্ত এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়। প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত চুক্তিতে না গেলেও বিনিয়োগকারীদের তীব্র চাপ, আইনি হুমকি ও প্রচারণা প্রমাণ করে, সংস্কারের পথে রাজনৈতিক অর্থনীতি কতটা কঠিন।

আস্থার সঙ্কট

এই দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতা বিদ্যুৎ খাতে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। ট্যারিফ বাড়লেও সেবার মানে দৃশ্যমান উন্নতি নেই। এতে- ভোক্তার আস্থা কমছে, উন্নয়ন অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জটিল হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের সঙ্কট কেবল প্রযুক্তিগত বা আর্থিক নয়- এটি গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক। কিউইইইএস আমলে গড়ে ওঠা আইন, চুক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্য জবাবদিহিকে দুর্বল করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দখলের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

এই বাস্তবতায় কেবল নতুন নীতিমালা বা দরপত্র সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন- জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং চুক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য পুনর্গঠন।

এই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানো, আস্থা ফেরানো বা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।