পতনে সপ্তাহ শেষ
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতায় আস্থাহীন পুঁজিবাজার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধবিরতি ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশের শেয়ারবাজারে স্বস্তি ও শঙ্কার টানাপড়েন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইস্যুতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় একদিনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও লেবাননে নতুন করে হামলার খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে আবারো নি¤œমুখী হয়েছে পুঁজিবাজার।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সামান্য নেতিবাচক খবরে বিক্রির চাপ বাড়ছে, আর ইতিবাচক প্রবণতা টেকসই হচ্ছে না। ফলে বাজার কার্যত দিক হারিয়ে ফেলছে।
গতকাল দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৬০ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ২৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৩ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ নেমেছে দুই হাজার ২ পয়েন্টে।
ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৭০টির শেয়ারদর বেড়েছে, বিপরীতে ৩০৬টির দর কমেছে এবং ১৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। দিনশেষে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকায়, যা আগের দিনের তুলনায় ২১৪ কোটি টাকার বেশি কম।
এ দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র দেখা গেছে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই কমে ১৪ হাজার ৭৫৪ পয়েন্টে নেমেছে। লেনদেনে অংশ নেয়া ১৯৫টি কোম্পানির মধ্যে অধিকাংশের দর কমেছে। যদিও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ১১০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, তবুও সূচকের পতন বাজারের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করছে।
এদিকে করপোরেট ঘোষণার মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড ২০২৫ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা বাজারে আংশিক ইতিবাচক বার্তা দিলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিবর্তনে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি।
অন্যদিকে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল অ্যান্ড বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের শেয়ারদর কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপ। এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল ডিএসইর ব্লক মার্কেটেও উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ফাইন ফুডস লিমিটেড, তৌফিকা ফুডস ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল।
এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ প্রেেিত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কঠোর পদপে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন, আইপিও থেকে উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার এবং সামগ্রিক ব্যবসা পরিচালনায় নানা অসঙ্গতি চিহ্নিত হয়েছে। এসব বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের একাধিক দৃষ্টান্ত পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এর আগেও একই ধরনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।
বিএসইসি জানায়, কোম্পানিটির আইপিও তহবিল ব্যবহার, নিরীতি আর্থিক প্রতিবেদন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিশনে জমা দেয়া প্রতিবেদনে ২০২০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচটি অর্থবছরের নিরীতি আর্থিক বিবরণী, পরিশোধিত মূলধন এবং আইপিও তহবিল ব্যবহারে আইন ও বিধি লঙ্ঘনের বিষয় উঠে এসেছে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রণয়নাধীন ‘প্যানেল অব অডিটরস’ গাইডলাইনে নতুন শর্ত যুক্ত করা। ভবিষ্যতে নিরীকদের আন্তর্জাতিক হিসাবমান লঙ্ঘনের েেত্র সংশ্লিষ্ট ধারা বা অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি কোনো কোম্পানি যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন, বিধি বা নির্দেশনা লঙ্ঘন করে, তা নিরীা প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে।
তদন্তকার্যক্রম আরো জোরদার করতে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। এ ল্েয বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) সাথে তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আর্থিক সমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’ বা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সমতায় সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সর্বশেষ আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ০.১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩২ পয়সা, যেখানে আগের বছর শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৩৫ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) হয়েছে ১২ টাকা ৫৩ পয়সা।
২০১৮ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এ তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি বর্তমানে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। এর পরিশোধিত মূলধন ১১৬ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং মোট শেয়ারসংখ্যা ১১ কোটি ৬২ লাখের বেশি। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের কাছে রয়েছে ২৪.৪৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৮.৭৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫৬.৮১ শতাংশ শেয়ার। সর্বশেষ লেনদেনে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৩০ পয়সা।