গাজার ছকেই ভূমি দখলের ইহুদি কূটচাল
লেবাননেও ইয়েলো লাইন স্থাপন করবে ইসরাইল
Printed Edition
আলজাজিরা
গাজার মতো লেবাননেও বিতর্কিত সামরিক কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে ইসরাইল। দক্ষিণ লেবাননে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা ‘হলুদ রেখা’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত যুদ্ধবিরতির আড়ালে লেবাননের ভূমি দীর্ঘমেয়াদে দখল করে রাখার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।
শনিবার ইসরাইলি বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ‘হলুদ রেখা’র দক্ষিণে অবস্থান করে তারা এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করেছে, যারা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে উত্তর দিক থেকে সেনাদের কাছে আসছিল এবং তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করছিল। এই প্রথমবারের মতো লেবাননে এমন একটি সীমারেখার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করল ইসরাইল।
গত বৃহস্পতিবার থেকে লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এই প্রথম ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হলুদ রেখা’ শব্দটি ব্যবহার করল।
এর আগে গাজা উপত্যকায় ‘হলুদ রেখা’ ব্যবহার করে অঞ্চলটিকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল ইসরাইল। পূর্বাংশ তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিমাংশে তুলনামূলকভাবে চলাচলে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়। তবে এই সীমারেখার কাছাকাছি গেলে গুলি চালানো, বাড়িঘর ধ্বংসসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৭৭৩ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননেও একই পদ্ধতিতে ‘হলুদ রেখা’ কার্যকর করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, ইসরাইল কেবল ‘আত্মরক্ষা’র প্রয়োজনে হামলা চালাতে পারবে। তবে ইসরাইল এই ‘আত্মরক্ষা’র সংজ্ঞা দিচ্ছে অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে।
ইসরাইলি বাহিনী হলুদ রেখাসংলগ্ন লেবাননের গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি ধ্বংস, আর্টিলারি ও মেশিনগান হামলা অব্যাহত রেখেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দু’টি বিমান হামলা চালিয়েছে তারা- একটি তথাকথিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে, অন্যটি একটি সুড়ঙ্গ এলাকায়। ইসরাইলের দাবি, রেখা পার হওয়ার আগেই ‘সম্ভাব্য হুমকি’ মনে করে তারা হামলা চালাচ্ছে, যা তাদের মতে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন নয়।
জাফাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহাদেহর মতে, এটি ইসরাইলের নতুন সামরিক কৌশলের অংশ, যা শুধু লেবানন নয়, সিরিয়াতেও প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, এই কৌশল তিনটি স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে ‘রেড লাইন’, ‘হলুদ লাইন’ এবং লিতানি নদী। লক্ষ্য হলো দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় দখল করা এলাকা চাপ হিসেবে ব্যবহার করা। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ আলোচনায় লেবানন সরকার যেকোনো দাবি তুললে ইসরাইল এই দখলকৃত ভূমিকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।’
ইসরাইলি গণমাধ্যমের জরিপ অনুযায়ী, ইসরাইলের প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ লেবাননে দখল বজায় রাখার পক্ষে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন চাপের চেয়েও সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই ইসরাইল বর্তমানে এই সীমিত যুদ্ধবিরতির পথে হেঁটেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের দখলদারত্বের আকাক্সক্ষা বিন্দুমাত্র কমেনি।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম ইসরাইল লেবাননে এ ধরনের কোনো সীমারেখার কথা উল্লেখ করল। গত ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটি একটি ‘ইয়েলো লাইন’ দ্বারা বিভক্ত। এই রেখাটি কার্যত গাজাকে দু’টি সামরিক জোনে ভাগ করেছে- যার একটি ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং অন্যটি হামাসের নিয়ন্ত্রণে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। এতে কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। একই সময়ে সীমান্তের কাছাকাছি কৌশলগত কিছু এলাকা দখলের কথাও জানিয়েছে ইসরাইল। এ ছাড়াও, জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলের ওপর হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন। অন্য দিকে রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধবিরতির পর সরাসরি আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে লেবানন। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নিতে চান। তবে হিজবুল্লাহ এ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে।