সৃজন শপথে ষাট বসন্ত, শিল্পের আলোয় তৌকীর আহমেদ
Printed Edition
সাকিবুল হাসান
সৃজনশীলতার মিছিলে হেঁটে হেঁটে জীবনের ষাটটি বসন্ত পার করে এলেন এক পলিমাটির শিল্পী, যার নাম তৌকীর আহমেদ। পর্দার সামনে তিনি কখনো শাশ্বত প্রেমিক, কখনো দ্রোহী যুবক; আর পর্দার পেছনে তিনি এক মগ্ন নির্মাতা। গত রোববার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় যখন ‘ছয় দশক পেরিয়ে তৌকীর আহমেদ’ শীর্ষক উৎসবের প্রদীপ জ্বলল, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির জন্মদিন হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছিল শিল্প আর মানুষের নাড়ির বন্ধন উদযাপনের এক বর্ণাঢ্য মহোৎসব।
সকাল থেকেই সঙ্গীতের মূর্ছনা আর নৃত্যের ছন্দে নাট্যশালা প্রাঙ্গণে উৎসবের রঙ লাগে। দিনব্যাপী এই আয়োজনে মিলেমিশে একাকার হয়েছিলেন টেলিভিশন ও মঞ্চের কয়েক প্রজন্মের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সেমিনারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তৌকীর আহমেদ তার দীর্ঘ পথচলার দর্শন তুলে ধরেন। তার মতে, সৃষ্টির মাধ্যমেই সময়কে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব। বর্তমান সমাজের অস্থিরতা আর মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শিল্পের সুকুমার বোধই মানুষকে কঠিন সময়ে মানসিক আশ্রয় দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পীদের আরো সোচ্চার হওয়ার এবং শিল্পের দায়বদ্ধতাকে বুকে ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রবীণ নাট্যজন মামুনুর রশীদ বর্তমান সময়ের ‘ভিউ-নির্ভর’ সস্তা কনটেন্ট সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্রেফ জনপ্রিয়তার এই অন্ধ দৌড় শিল্পচর্চার প্রকৃত মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে এবং প্রকৃত সৃজনশীলতার আকাশকে সঙ্কুুচিত করে ফেলছে। অন্যদিকে, অভিনেতা আফজাল হোসেন তৌকীর আহমেদের নিয়মনিষ্ঠা ও বহুমাত্রিক প্রতিভার কথা স্মরণ করে বলেন, শিল্পীদের প্রকৃত সত্তা অনেক সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়; এমন আয়োজনই পারে তাদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সবার সামনে তুলে আনতে। অভিনেতা মাহফুজ আহমেদও তৌকীরের কাজের বৈচিত্র্যকে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ পাঠশালা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিকেলের দিকে উৎসবের মোড় ঘোরে রুপালি পর্দার জাদুর দিকে। জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় তৌকীর আহমেদ পরিচালিত আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’। অভিবাসন সঙ্কটের মানবিক হাহাকার আর শেকড়বিচ্ছিন্ন মানুষের গল্পটি দেখে দর্শকরা যেমন আবেগাপ্লুত হয়েছেন, তেমনি প্রদর্শনী পরবর্তী আলোচনায় চলচ্চিত্রটির কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলী নিয়ে বিদগ্ধ মহলের প্রশংসা উঠে আসে। চলচ্চিত্রটি কেবল একটি কাহিনি নয়, বরং সমকালীন বিশ্বের এক নির্মম সত্যের দলিল হিসেবে দর্শকদের হৃদয়ে রেখাপাত করে।
আবুল হায়াত, গাজী রাকায়েত, ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও আজীজুল হাকিমসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অসংখ্য গুণীজনের উপস্থিতিতে পুরো উৎসবটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়। স্মৃতিচারণ, বর্তমানের সঙ্কট এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংলাপে ভরপুর। দিনশেষে এই উৎসবটি কেবল তৌকীর আহমেদের ছয় দশকের জীবনের মাইলফলক উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা হয়ে রইল একজন আপাদমস্তক শিল্পীর প্রতি তার সতীর্থ, অনুরাগী ও গোটা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক অসামান্য স্মারক।