কৃষি বিপণনে সিন্ডিকেট ভাঙতে কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ

Printed Edition

শাহ আলম নূর

দেশের কৃষিবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে সরকার সরাসরি বিপণন, ডিজিটাল সংযোগ এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য বাজারব্যবস্থায় গভীর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কৃষিপণ্য পৌঁছাতে চার থেকে ছয় স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত। এদিকে কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, অনেক েেত্র কৃষক পর্যায়ে যে দামে পণ্য বিক্রি হয়, খুচরা বাজারে সেই দাম ৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে, কৃষক পর্যায়ে টমেটো ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হলেও শহরে তা ৬০-৮০ টাকায় পৌঁছে।

সরকার এই ব্যবধান কমাতে ‘কৃষকের বাজার’, ‘ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস)’ এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। বর্তমানে টিসিবির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নি¤œ আয়ের পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য বিপণনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে কৃষক সরাসরি ক্রেতার সাথে যুক্ত হতে পারেন।

তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শুধু বাজারে সরাসরি বিক্রয় কেন্দ্র বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের কৃষিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে তথ্যের স্বচ্ছতা নেই, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ নেয়। বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক ও তথ্যনির্ভর না করলে এই সমস্যা কমবে না।

তিনি আরো বলেন, কৃষিপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে দামের ব্যবধান কমানো কঠিন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংরণ ও পরিবহন ঘাটতির কারণে নষ্ট হয়। এই অপচয় মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি করে। যদি এই অপচয় ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দামের ওপর চাপ কমবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের পুরোপুরি বাদ দেয়া সম্ভব নয়, কারণ তারা পরিবহন, সংরণ ও বাজারজাতকরণে ভূমিকা রাখে। তবে তাদের সংখ্যা কমিয়ে এবং কার্যক্রম স্বচ্ছ করলে বাজারে ভারসাম্য আসবে। তিনি কৃষকদের সমবায়ভিত্তিক বিপণনব্যবস্থায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, কৃষকদের সংগঠিত না করলে তারা বাজারে দরকষাকষির মতা অর্জন করতে পারবেন না। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষক ব্যক্তিগতভাবে পণ্য বিক্রি করেন, ফলে তারা পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

এদিকে ডিজিটাল কৃষিবাজার চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দতা এবং আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার না করলে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না। অনেক সময় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়, যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে হলে সরবরাহ শৃঙ্খলা উন্নয়ন, বাজারে স্বচ্ছতা, কৃষকদের সংগঠিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অন্যথায়, কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং ভোক্তাদের বাড়তি দামে পণ্য কেনার এই চক্র অব্যাহত থাকবে।