গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির
Printed Edition
- ৫ শিশুসহ নিহত আরো ১৩০
- ক্যান্সার হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিলো ইসরাইল
- পশ্চিমতীরে ৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা
- ইসরাইলের জন্য হামাস এখনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর বিমান ও স্থল অভিযানের মধ্যে বিবাদমান পক্ষগুলোকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি। এ খবর জানিয়েছে আলজাজিরা। গত শুক্রবার দেশ তিনটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক যুক্ত বিবৃতিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডটিতে মানবিক সহায়তা ঢোকার অনুমতি দিতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বানও জানানো হয়েছে। অন্য দিকে গাজা সিটিতে রাতভর ইসরাইলি বিমান হামলায় পাঁচ শিশু নিহত হয়েছে এবং পরিবারটির অন্তত আট সদস্য ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।
এ দিকে গাজা উপত্যকার একমাত্র ক্যান্সার হাসপাতালটি বোমা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে দখলদার ইসরাইল। দখলদার ইসরাইল নেতজারিম করিডোর সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়ার পরই হাসপাতালটি ধ্বংস করে দেয়া হলো। তা ছাড়া পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে সিনাইয়ে আশ্রয় দেয়ার কথা অস্বীকার করেছে মিসর। দেশটির স্টেট ইনফরমেশন সার্ভিস (এসআইএস) জানিয়েছে, এ-সংক্রান্ত খবর মিথ্যা ও ভুয়া। এর আগে ই-থ্রি নামে পরিচিত ইউরোপীয় দেশ তিনটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা ইসরাইলের প্রতি পানি, বিদ্যুৎ সুবিধা পুনর্বহালসহ মানবিক সহায়তা প্রবেশে অনুমতি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসার জন্য অস্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করার আহবান জানাই।” গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় ‘স্তম্ভিত’ এ মন্ত্রীরা ইসরাইলি বন্দিদের মুক্তি দিতে হামাসের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা বলেছেন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার চলমান সঙ্ঘাত সামরিকভাবে সমাধান করা যাবে না। শান্তি প্রতিষ্ঠায় আস্থা রাখার মতো পথ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি। মন্ত্রীরা গাজায় জাতিসঙ্ঘের প্রকল্প পরিচালনা কার্যালয় (ইউএনওপিএস) ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায়ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন।
নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি : আলজাজিরার খবর অনুসারে, গত মঙ্গলবার থেকে গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় প্রায় ৭০০ জন নিহত এবং এক হাজার ১৭২ জন আহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় নিহতের সংখ্যা ১৩০ জন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নিশ্চিত হতাহতের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৭৪৭ এবং আহতের সংখ্যা এক লাখ ১৩ হাজার ২১৩ জন বলে জানা গেছে।
ক্যান্সার হাসপাতাল ধ্বংস : গাজায় শুক্রবার তার্কিশ-প্যালেস্টাইন ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল ও সংলগ্ন একটি মেডিক্যাল বিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, হাসপাতালটি গাজায় ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ছিল। হাসপাতালে হামলা চালানো নিয়ে ইসরাইলি বাহিনী বলেছে, হাসপাতাল এলাকায় হামাসের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন, তাই হামলা চালানো হয়েছে।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, হাসপাতালে হামলা ছাড়াও বুলডোজার চালিয়ে আবাসিক ভবন ও কৃষিজমি ধ্বংস করেছে ইসরাইলি বাহিনী। অন্য দিকে গাজার এক অংশ এখনই দখলে নেয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটি। এ নিয়ে ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীকে নির্দেশনাও দিয়েছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। খবরে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ আরো স্থল অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি হুমকি দিয়েছেন, হামাস যদি যুদ্ধবিরতির চুক্তি না মানে এবং বন্দীদের মুক্তি না দেয় তাহলে এখনই এক অংশ দখলে করে নেবেন তারা। এএফপি জানিয়েছে যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হামাস বন্দীদের মুক্তি দিতে যত বেশি দেরি করবে, আমরা তত বেশি গাজার ভূখণ্ড দখলে নেব।
পশ্চিমতীরে ৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা : আলজাজিরার খবর অনুসারে, অধিকৃত পশ্চিমতীরে পাঁচ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয় সর্বশেষ রিপোর্টে এ তথ্য জানিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী ১১-১৭ মার্চের মধ্যে, অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমসহ উপত্যকাটিজুড়ে পাঁচজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ জন শিশুসহ ৮২ জন আহত হয়েছে।
একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হত্যা, সম্পত্তির ক্ষতির মতো ৩৪টি নথিভুক্ত ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এক সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে এতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের অবাধ চলাচলে বাধা সৃষ্টিতে পশ্চিমতীরে ৮৪৯টি পরিকল্পিত ঘটনা ঘটিয়েছে ইসরাইলিরা। এর মধ্যে ২৮৮টি ঘটনায় গেট বন্ধ করে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুকে চিঠি : টাইমস অব ইসরাইলের খবর অনুসারে, গাজায় নতুন সামরিক অভিযান বন্ধ করে হামাসের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন হামাসের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া ৪০ জন ও গাজায় আটক বন্দীদের ২৫০ স্বজন। শুক্রবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি চিঠি লিখে এই আহ্বান জানান তারা। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘এই চিঠিটি রক্ত ও অশ্রু দিয়ে লেখা’, যেখানে বন্দিদশায় নিহতদের স্বজনরা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা সরকারকে আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে এমন একটি চুক্তি করতে বলছেন, যা সব বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ করবে। চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যুদ্ধে জীবিত বন্দীদের হত্যা করা হচ্ছে, আর মৃতদের নিখোঁজ ঘোষণা করা হচ্ছে’। এ পর্যন্ত ৪১ জন বন্দী প্রাণ হারিয়েছেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, যদি আলোচনা করা হতো, তবে তারা হয়তো বেঁচে ফিরতে পারতেন।
ইসরাইলের জন্য হামাস এখনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ : চলতি সপ্তাহে গাজায় আবার হামলা শুরু করেছে ইসরাইল। তাদের অব্যাহত বিমান হামলায় গাজা সরকারের প্রধানসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। রয়টার্স জানায়, তবে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে পাল্টা আক্রমণ ও গাজা পরিচালনার সক্ষমতা দেখা গেছে হামাসের মধ্যে। ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রতিবারই নিজেদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে হামাস।
গত অক্টোবরে হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর নতুন কাউকে বাছাই করার পরিবর্তে পরিষদের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি। এতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি হামলার শিকার হওয়া এবং একক ব্যক্তিনির্ভরতা হ্রাস পাবে বলে আশা করছে তারা। এ ছাড়া ইসরাইলে হামলার জন্য রকেট ব্যবহারের বদলে আবারো গেরিলা কায়দায় হামলার দিকে মনোযোগ বৃদ্ধি করছে তারা। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বরাবর বলে আসছেন, হামাসের সামরিক শক্তি নিশ্চিহ্ন এবং শাসনক্ষমতা ধ্বংস করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে তিনি বলেছেন, হামাসের কাছে এখনো বেশ কয়েকজন বন্দী রয়েছেন। এসব হামলার মাধ্যমে হামাসের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যেন সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়। হামাস ও ইসরাইলের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছে রয়টার্স। ফিলিস্তিনি সংগঠনের সক্ষমতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত বিশেষজ্ঞদের সাথেও তারা আলাপ করেছে। ইসরাইলের জন্য হামাসের ঝুঁকির বিষয়ে সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্রমাগত আক্রমণে অনেকটাই দুর্বল হলেও হামাস এখনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠানের (ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ) গবেষক কোবি মাইকেল সতর্ক করে বলেছেন, হামাস এখনো টিকে আছে। তারা গাজায় এখনো শাসন করে যাচ্ছে এবং দল পুনর্গঠনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।