আলোচনার সুযোগ আছে : সরকারি দল
সমঝোতা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের অভিযোগ বিরোধীদের
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো হুবহু পাসের ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ ভঙ্গের অভিযোগে সংসদ অধিবেশন থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের ঘটনা দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল’ পাস নিয়ে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ ভঙ্গের অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও সরকারি দল তা ভঙ্গ করেছে। পরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানও একই অভিযোগ আনলে তার নেতৃত্বে বিরোধী জোট সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন। প্রধানত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ সংশোধিত আকারে পাস এবং ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ উত্থাপন না করায় এ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সরকারি দল বিষয়টিকে সংবিধান অনুযায়ী আইনানুগ দাবি করেছে এবং পরবর্তীতে আলোচনার সুযোগ আছে বলে উল্লেখ করে। এ ছাড়া ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’ বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হয়। অপর দিকে বিরোধী সদস্যদের অনুপস্থিতিতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল ২০২৬ সংশোধনীসহ পাস করা হয়।
সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯৮টি বিল হুবহু পাস করার কথা থাকলেও, সরকার ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল’টিতে হঠাৎ তিনটি সংশোধনী এনে পাস করেছে। বিল পাসের মাত্র আধঘণ্টা আগে সংশোধনী আনাকে ‘জোচ্চুরি’ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একইসাথে দুদক, মানবাধিকার কমিশন, তামাক নিয়ন্ত্রণসহ ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন না করায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান আস্থার সঙ্কট এবং স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন।
বিরোধী দলের অভিযোগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সরকার সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ ও কার্যপ্রণালি বিধি মেনেছে। ১৬টি অধ্যাদেশ আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার জন্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পরে আলোচনা করেই তা আনা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর বিলের সংশোধনীগুলো অভ্যুত্থানের স্পিরিট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার স্বার্থেই আনা হয়েছে, যা জাতির সম্পদ।
সূত্র মতে, গত শুক্রবার ২৪টিসহ জাতীয় সংসদে মোট ৯১টি অধ্যদেশ পাস হয়েছে। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ সংশোধনীসহ পাস এবং ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’ বিল নিয়ে আপত্তি জানায় বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে সরকারি দলের সাথে তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন না করা এবং আপত্তি সত্ত্বেও সংশোধনী এনে সরকারি দল ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস করায় চতুর্থবারের মতো ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
এদিকে বিতর্কের সূত্রপাত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ নিয়ে। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য আনিছুর রহমান এই বিলের ওপর তিনটি সংশোধন প্রস্তাব করেন। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, বিশেষ কমিটির সভা অনুযায়ী অধ্যাদেশটা হুবহু পাস করার কথা ছিল। হঠাৎ করে এই সংশোধন আনায় সমঝোতা ভঙ্গ হয়েছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিলটি পাসের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে একটি সংশোধনী এনে পূর্বের ঐকমত্যকে নস্যাৎ করা হয়েছে, যা সংসদীয় রীতিনীতি ও রাজনৈতিক আস্থার পরিপন্থী। তিনি এ ঘটনাকে ‘দিনে-দুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মহোৎসব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অন্য দিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, সংশোধনীটি সরকার আনেনি, বরং একজন বেসরকারি সদস্যের প্রস্তাব হিসেবে এসেছে। তিনি যুক্তি দেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রীদের সভাপতিত্ব করা অস্বাভাবিক নয় এবং এটি দলীয়করণের শামিল নয়। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো সংসদ সদস্য সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে পর্ষদের ওপর সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি আরো জানান, কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আরো যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী করার জন্য বিলম্ব করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কোটি কোটি আমানতকারীর সুরক্ষা এবং ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’ নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি ও জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব নাকচ করে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাইফুল আলম মিলন (ঢাকা-১২) জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেন। বিলের বিরোধিতা করে সাইফুল আলম মিলন বলেন, আমানতকারীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। এ অধ্যাদেশগুলো ৯১টি বিল আকারে পাস করা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। যদিও বিরোধী দল থেকে বলা হয়, আরো বাকি ২০টির মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি আরো শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়। তবে, এ ১৬টির মধ্যে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইনে ফিরে যায় সরকার। সে অনুযায়ী মোট পাঁচটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সরকার। ফলে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ শুক্রবার নির্ধারিত সময়ে উত্থাপন না করায় ‘ল্যাপস্’ হয়ে গেল।
সূত্র মতে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন ও পাস না করলে সংসদ শুরুর এক মাসের মধ্যে অটোমেটিক ল্যাপস হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী গত শুক্রবার ছিল শেষ দিন। বিশেষ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করে। যদিও বিশেষ কমিটির এই বৈঠকে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এতে বিরোধিতা করেন। ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত একটি আদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইন ফিরিয়ে আনে সরকার। শুক্রবার নির্ধারিত সময়ে সংসদে উত্থাপন না করায় যেসব অধ্যাদেশ অটোমেটিক বাতিল হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো হলো- রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন), ২০২৬; বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক ও তাদের ২০২৬, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬। তবে, এই তালিকায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-ও রয়েছে।
এ ছাড়া সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হওয়া সাতটি অধ্যাদেশ হচ্ছে ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এবং ২০২৪-২০২৫ সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।
সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের ও আহত ছাত্র-নাগরিকদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’, ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ ও ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘আবগারি ও লবণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল, ২০২৬’, ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সুরক্ষা) বিল, ২০২৬’, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬’, ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সাইবার নিরাপত্তা বিল, ২০২৬’, ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘অর্থ বিল (অর্থবছর ২০২৫–২৬), ২০২৬’, ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উল্লেখযোগ্য।
বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল হতে দেওয়া হয়েছে, ফলে সংসদ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিরোধীদলীয় প্রধান ডা: শফিকুর রহমান বলেন,অধ্যাদেশ বিষয়ক বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন বিরোধী দলের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা তিনি আস্থাভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বিল অনুপযুক্তভাবে পাস করা হয়েছে। তিনি বলেন, কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে শেষ দিন মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং গুম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।