ফ্রি ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সর্বস্বান্ত জেল খেটে ফিরছেন অনেক কর্মী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফ্রি ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক সর্বস্বান্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আকামা নবায়ন করাতে না পারায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে তাদেরকে যেতে হয়েছে কারাগারে। কারাগারে নির্যাতিত হয়ে একপর্যায়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে দেশে। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত ‘ফ্রি ভিসার’ নামে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও আমিরাত গিয়ে শত শত বাংলাদেশী যুবক প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব ভিসায় গিয়ে কর্মীরা সর্বস্বান্ত হলেও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওই দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মীরা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেকটাই উদাসীন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এসব ঘটনায় শুধু যে কর্মীরাই প্রতারিত হচ্ছেন তা কিন্তু নয়, দেশের ভাবমর্যাদাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে ফ্রি ভিসার কথা বলে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা প্রতিনিয়ত গ্রামের সহজ সরল মানুষকে বিদেশে পাঠাচ্ছে। ওই সব কর্মী সেখানে যাওয়ার কিছুদিন না যেতেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে। ফ্রি ভিসায় যাওয়া কর্মীরা ভালো কাজের সন্ধানে অন্যত্র পালিয়ে কাজ শুরুর চেষ্টা করেন। আর তখনই বাধে বিপত্তি। ফলে কখনো কর্মস্থল থেকে, আবার কখনো হাটবাজার থেকে পুলিশের অভিযানে তারা আটক হন। এরপর তাদের ঠিকানা হয় ওই দেশের কারাগার। সেই কারাগারে কাউকে এক মাস, কাউকে আবার দুই মাস রেখে বিমানের টিকিট দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এসব হতভাগ্য প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধারাই বিমানবন্দরে নেমে ওই দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এবং তাদের নিয়োগকৃত দালালদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ জানান। এমন অভিযোগ এখন প্রায়ই শোনা যায়। এরপরও ফ্রি ভিসার নামে কর্মীদের পাঠানো সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তেমনটি কেউ শোনেনি বলে অভিযোগ কর্মীদের, যার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সম্প্রতি সৌদি আরবের সফর জেলে দেড় মাস কারাভোগের পর দেশে ফিরেছেন মোরশেদ আলম সুমন নামের এক রেমিট্যান্সযোদ্ধা। তার দেশের বাড়ি নোয়াখালী। তিনি বর্তমানে থাকেন উত্তরা এলাকায়। শুধু সুমন নয়, তার সাথে সৌদির সফর জেল থেকে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন আরো কয়েকজন প্রবাসী।

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সুমন গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আমি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। সৌদিতে এই বছরের জানুয়ারি মাসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। আমাকে নেয়া হয় থানায়, এরপর জেলে। থানা, জেল আর এয়ারপোর্ট-সবখানে আমার ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। সুমনের অভিযোগ, জেলে থাকা পর্যন্ত আমাদের দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তা এক দিনের জন্যও খোঁজ নিতে আসেননি। জেল থেকে ছাড়ার সময় সৌদি কর্তৃপক্ষই বিমান টিকিট দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছে। কী কারণে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল জানতে চাইলে সুমন বলেন, কোম্পানির কফিলকে টাকা দেয়ার পরও আমার আকামা নবায়ন করে দেয়নি। অবৈধ হওয়ার অভিযোগে পুলিশ একটি বাজার থেকে ধরে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের আকামা নেই তাদেরকেও পুলিশ রাস্তা থেকে ধরে ধরে কারাগারে আটকে রেখেছে। এমন বলে দাবি করেন তিনি।

সুমনের মতো অনেক বাংলাদেশী ফ্রি ভিসায় ধরা পড়ে জেলে গিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। হচ্ছেন নিঃস্ব। শুধু সৌদি আরব গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন তা নয়; আরব আমিরাত, কাতারে গিয়েও একইভাবে অনেকে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। যদিও কিছু দিন ধরে আমিরাতের দুবাইয়ে ভিজিট ভিসা বন্ধ রয়েছে।

গতকাল দুবাই থেকে বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও প্যান ব্রাইট ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিক রুহুল আমিন মিন্টু নয়া দিগন্তকে বলেন, আসলে ফ্রি ভিসা বলতে কোনো ভিসা নেই। এটা কিছু এজেন্সি ও তাদের বানানো বুলি। মূলত একজন শ্রমিক এমপ্লয়মেন্ট ভিসা নিয়ে দুবাইয়ের একটি কোম্পানিতে আসেন; কিন্তু আসার পর ওই কোম্পানিতে কাজ না করে তিনি পালিয়ে অন্য কোম্পানিতে চলে যান। ওটাকেই দালালরা ফ্রি ভিসার নামে চালিয়ে দেয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুবাইতে এখন অনেক কোম্পানিতে প্রচুর কাজের চাহিদা আছে; কিন্তু আমিরাত সরকার নানা কারণে বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনার অনুমতি দিচ্ছে না। তার মতে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ানো উচিত। তবে তিনিও স্বীকার করেন, ভিজিট ভিসায় এসে এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় রিপ্লেসমেন্ট করতে না পারার কারণে অনেক বাংলাদেশী অবৈধ হয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে তখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলেও গিয়েছিলেন।

গতকাল কুয়েত থেকে জালাল উদ্দিন নামের একজন প্রবাসী নয়া দিগন্তকে বলেন, কুয়েতে আগে ফ্রি ভিসার নামে অনেক লোক আসতো। তাদের অনেককে অবৈধ হয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সফর জেলে যেতে হয়েছে। এখনো অনেকে অবৈধ অবস্থায় কুয়েতে আছে। তাদের ধরতে পুলিশ প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে। ফ্রি ভিসা সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে যারা ভিসার ব্যবসা করেন তারা কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর চার-পাঁচ লাখ টাকায় একটি ভিসা কিনেন। সেই ভিসায় আসা কর্মীদের কমপক্ষে এক বছর কাজ করার নিয়ম; কিন্তু অনেকেই তার আগে লোভে পড়ে পালিয়ে যায়। তখনই সে অবৈধ হয়ে যায়। তখন পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তাকে প্রথমে জেলে নেয়া হয়। এরপর জেল থেকে বিমানে তুলে ওই কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তিনি বলেন, আগে কোম্পানিতে ফ্রি ভিসায় আসা একজন কর্মী পাঁচ বছর সময় পেতেন। এখন কুয়েত সরকার সেটি কমিয়ে এক বছর সময় নির্ধারণ করেছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, চাকরি নিশ্চিত করা ছাড়া কারো বিদেশ যাওয়া একদমই উচিত নয় বলে আমি মনে করি। এ ক্ষেত্রে যারা এই ভিসায় গিয়ে প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়েছেন তাদের বিষয়ে সরকারের করণীয় কী হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে এই অভিবাসন বিশ্লেষক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই দেশের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে এসব শ্রমিককে বৈধতা দেয়ার একটা পদক্ষেপ নিতে পারেন। একই সাথে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া। তাহলে শ্রমিকদের জন্য ভালো হতো।

বলা বাহুল্য, সৌদি আরবে একজন কফিল (স্পন্সর) পাঁচ-এর অধিক ওয়ার্ক ভিসা (ফ্রি ভিসা) সংগ্রহ করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে কারো তিন মাস, কারো ছয় মাস আবার কারো এক বছর মেয়াদি ওয়ার্ক ভিসায় কর্মী নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব কর্মীরা জেনে-শুনে ফ্রি ভিসার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব পাড়ি জমান বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব কর্মী পরবর্তী সময়ে অন্যত্র (বেশি বেতনে) গিয়ে কাজ শুরু করলেও সময় মতো কফিলের কাছ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে আকামা নম্বর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

তখন থেকেই তাদের দুর্ভোগ শুরু হয়। রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা জানান, ফকিরাপুল, নয়াপল্টন এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা এজেন্সি থেকে গণহারে ফ্রি ভিসায় লোক পাঠানোর ব্যবসা চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে গিয়ে কর্মীরা কাজ না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা এবং পুলিশে ধরা পড়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় ফ্রি ভিসায় কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমেছে বলে জানান তারা। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ বড় বড় নিয়োগকারী কোম্পানিতে গিয়েও বাড়তি বেতনের লোভে অন্য কোম্পানিতে গিয়ে অনেক শ্রমিক বিপদে পড়ছেন বলেও জানান তারা।