আমদানি-রফতানি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁঁকি বাড়বে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ

Printed Edition

- আগাম প্রস্তুতি রাখতে সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে : মে. জে. রোকন উদ্দিন

- যুদ্ধবিরতি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে জড়িত : সহিদুল আলম স্বপন

এস এম মিন্টু

বুধবার ভোরে টানা চল্লিশ দিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের সমস্ত দেশের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। স্বস্তির এ ঘোষণায় বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল। কিন্তু ইসরাইল যখন সে চুক্তি ভঙ্গ করে লেবাননে একের পর এক হামলা চলিয়ে শতাধিক স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইরানও পাল্টা হামলা চালায় ইসরাইলের ওপর। যুদ্ধ চলমান থাকায় ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। এ বিরতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা কমিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি পণ্য পরিবহনে নৌপথের ঝুঁকি কমাবে। কিন্তু যুদ্ধ চলমান থাকলে এক চরম অবস্থা বিরাজ করবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স, জ্বালানি তেল ও খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম স্থিতিশীল হবে, ফলে আমদানি খরচ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিরাপদ থাকবে এবং প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক থাকবে। সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি-রফতানি নিরাপদ হবে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখবে। বৈশ্বিক অস্থিরতা কমলে উৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব কম পড়বে।

কিন্তু যুদ্ধবিরতি না হলে বাংলাদেশের ঝুঁকি বা বড় তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিঘিœত হলে লাখো বাংলাদেশী কর্মসংস্থান হারাবে এবং রেমিট্যান্স হ্রাস পাবে।

এ ছাড়াও প্রধান নৌপথগুলো বিপজ্জনক হয়ে পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানিতে ধীরগতি আসবে রফতানি চরম ব্যাহত হবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্বস্তিদায়ক খবর। কিন্তু চুক্তি শর্ত পূরণ না হলে ফের যুদ্ধে জড়ালে বাংলাদেশের জন্য চরম অস্থিরতা ও অস্বস্তিদায়ক হয়ে পড়বে। এ পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি রাখতে সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহিদুল আলম স্বপন বলেছেন, বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে নিছক শান্তির বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ মধ্যপ্রাচ্য এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে বহুমাত্রিক কৌশল, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক চাপ এ সবের প্রোপটে এমন সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রশ্নের জন্ম দেয়।তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার শর্তটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ জলপথ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণরেখা। ফলে এটি খোলা রাখা মানে শুধু আঞ্চলিক নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থও সুরতি রাখা। কাজেই, এ যুদ্ধবিরতি কেবল মানবিক বা রাজনৈতিক নয়; বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথেও গভীরভাবে জড়িত।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এ যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই স্থায়ী শান্তির দিকে নিয়ে যাবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে রূপ নেয় না। পারস্পরিক অবিশ্বাস, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

মেজর জেনারেল (অব:) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন বলেছেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান সঙ্ঘাত সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সঙ্কট। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি পারমাণবিক রাজনীতি, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা, গোয়েন্দা যুদ্ধ এবং কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতার জটিল সমন্বয়। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ সঙ্ঘাত গুরুত্বপূর্ণ শিা বহন করে বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং খাদ্যনিরাপত্তাসহ ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির েেত্র।

তিনি বলেন, ইরানের অভিজ্ঞতা দেখা যাচ্ছে যখন একটি দেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক চাপ তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে না। ‘বন্ধুত্ব সবার সাথে, নির্ভরতা কারো ওপর নয়’- এ নীতির বাস্তবায়নই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ভিত্তি। এ ছাড়াও নিজস্ব প্রতিরা সমতা গড়ে তোলা আজকের যুগে অপরিহার্য। বাংলাদেশকে তার সীমিত বাজেটের মধ্যেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে।

তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা টেকসই হয় না। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তার অর্থনীতিকে দুর্বল করলেও; অভ্যন্তরীণ সমতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা টিকে আছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রফতানি বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি প্রতিরা ব্যয় বহন করতে সম হয় এবং বাহ্যিক চাপ মোকাবেলায় সহায়তা করে।

একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না; এটি রা করতে হয় সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জন্য এ শিা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিরাপত্তা কোনো স্থির অবস্থা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং সমতার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়। এ সমতা বাড়াতে হলে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালীভাবে ব্যবহার করতে হবে।