আ প স হী ন প ঙ্ ক্তি মা লা
Printed Edition
আল মাহমুদ
খালেদা
তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছে বাংলার ভোরের আকাশ
এদেশের গুল্মলতা ছুঁতে চায় পল্লবিত আঁচল তোমার।
যেন এক প্রতিশ্রুতি হেঁটে যায় আমাদের কণ্টকিত কালের ভিতরে।
লাঞ্ছিতের আহ্বানে যেন মাটি জন্ম দিলো শস্যগন্ধী মাটিরই কন্যাকে।
প্রত্যাশার কণ্ঠস্বর কে জানে কী মন্ত্রবলে তুমি
কেবল ছড়িয়ে দিচ্ছো, মাঠঘাট আদিগন্ত শস্যের কিনারে।
আমরাও সাক্ষ্য দেবো, হ্যাঁ আমরা একদা দেখিছি,
দেখেছি মাতাকে এক অনিঃশেষ আঁধারে দাঁড়িয়ে
আলোর ডানার মতো মেলে দিয়ে ব্যাঘ্র দুই বাহু
এগারো কোটির মাঝে নেমেছিল বিদ্যুৎবিভায়!
কখনো ভুলো না যেন তোমার ঘোমটায় আছে মানুষের আশার বারুদ,
ভুলো না, তোমার বাক্য প্রতীক্ষিত নিঃশ্বাস জাতির।
অবিচল, পিঙ্গলাক্ষী হে মাতৃকা, মানুষের আশাকে জাগাও।
১৯/১১/৯২
শাহাবুদ্দীন নাগরী
ফিরে যান রাত্রিশেষে
পৌষের রাত্রিশেষ, ভোরের আজান ভেসে আসে,
দরোজা খুলেই দেখি থমকে আছে শীতল বাতাস,
নাগরিক সভ্যতা ধুয়ে যায় গভীর নিঃশ্বাসে,
কালো রঙ জমা করে নতজানু নীলাভ আকাশ।
কারো ধ্বনি কান্না হয়ে উড়ে যায় পাখিদের সাথে,
হাসপাতালের বেডে নিভে যায় আলোর প্রহর,
দু’চোখে উতলা ঢেউ, জমাট কষ্ট কাঁপে হাতে,
কোথাও শব্দ হয়, কেউ যেন খুঁড়ছে কবর।
পৃথিবীর লেনদেন শেষ করে ফিরে যান মমতাময়ী মা,
প্রার্থনায় লক্ষ মানুষ, নদীতে ঢেউ, প্লাবন থামে না।
মুজতাহিদ ফারুকী
খালেদা নামের তফসির
যখন হৃদয় বৃষ্টিভেজা এঁটেল মাটির মতো বিগলিত দীর্ণ ও শোকার্ত
দুর্ভেদ্য কুয়াশার দেয়াল ঘিরে আছে পুরো বাংলাদেশ
এই হাড়হিম শীতের রাতে আমি তোমার নামে শিশির সিক্ত
শব্দের ফুল গাঁথি
হ্যাঁ, আমি, নগণ্য নকিব এক হৃদয়ের রক্তক্ষরণের,
মুখে মুখে উচ্চারিত প্রতিটি ধ্বনির গূঢ় বাগার্থ শিকারি
খুব ভালো করে জানি তোমার নামের তফসির
খালেদা মানেই অবিচল, ‘অজয় অমর অক্ষয়’
কিন্তু
আপসহীন নেত্রীর শক্ত খোলসে বসে
কাঠিন্য ও নম্রতার যে কস্তুরি সুরভি তুমি ছড়িয়েছ
তা কেবল হাফিজের মর্মভেদী কবিতার প্রতিদ্বন্দ্বী।
অন্ধকারপ্রিয় চতুর শেয়ালরা তুমুল শোর তুলে
বারবার মগ্ন রাতের মৌনতা ভাঙতে চেয়েছে
আর তুমি, সারা ঘরে শবে বরাতের মোমের শিখার মতো
স্নিগ্ধ উদারতা অকাতরে বিছিয়ে রেখেছ।
আজ তোমার বাড়ি বদলের দিনে আমি শোকার্ত নিশ্চয়ই,
ভগ্নরথ নই মোটেও
এ তো শুধু সাময়িক চোখের অদেখা
মেঘ কেটে গেলে ধ্রুবতারা, কী করে দীপ্ত সুরত লুকাবে!
কে না জানে, খালেদা মানে অবিনশ্বর, আজ থেকে তুমি
সেই চিরন্তন পথের নিশানা, ঠিক দেখা দেবে
যত দিন বাংলাদেশ খালি চোখে আকাশ দেখার সাহস দেখাবে।
হাসান আলীম
দেশমাতার মহাপ্রয়াণ
মা, দেশমাতা, বেগম খালেদা জিয়া তুমি সত্যি সত্যি চলে গেলে আমাদের ছেড়ে,
তোমার আঠারো কোটি সন্তানেরে ছেড়ে
কোনো এক অজনা অদেখা অদৃশ্য জগতে
মহান প্রভুর কৃপাঞ্চলে!
মা তোমার তো অন্য কোনো ঠিকানা নেই, ছিল না,
দেশ ছেড়ে যাওনি তুমুল ঝড়ে জলোচ্ছ্বাসে
ভূমিকম্প ভূমিধসে,
তুমি কারাবরণে থেকেছ মৃত্তিকা সৌগন্ধে!
শত নির্যাতনে, রাক্ষসী থাবার রক্তচক্ষু, বিষাক্ত ছোবল তুমি হজম করেছ,
তুমি বিষপান করেছ, অনন্য হেমলক পাত্র ঠোঁটে স্পর্শ করে তুমি এরিস্টটলের মতো আজ মহানেতা, মহামাতা, বিশ্বনেতা হয়ে মহাপ্রয়াণের সরণিতে উড়াল দিয়েছ।
মা, যে দিন জিয়া দেশ সৃজনের মহাক্ষণ, মহাঘোষণা দিলেন, সে দিন তুমি ধারণ করলে এই দেশ, এই মৃত্তিকার শ্যামল সবুজ ভূখণ্ড,
প্রিয় সন্তান প্রিয় স্বদেশ স্বাধীনতার হৃৎপিণ্ড,
তুমি সাম্য, ন্যায়, ইনসাফ ধারণ করলে শক্ত হাতে,
তুমি হলে আপসহীন নেত্রী
দেশনেত্রী, দেশমাতা!
তুমি সকলকে ধারণ করলে
বিভেদের কাঁটাতার ছিন্ন করে কোলে তুলে নিলে তোমার অবহেলিত সন্তান সন্ততি!
মা, আজ তুমি চলে গেলে আমাদের ছেড়ে
আর কি এমন কেউ আসবে?
তুমি আমাদের কার হাতে রেখে গেলে?
আমরা কোথায় পাবো তোমার পবিত্র রেশমি আঁচল, কোথায় পাবো তোমার শ্যামল ছায়া!
কোথায় পাবো অভয়, নিরাপদ আশ্রয়! নিবাস,
স্বাধীন সুপ্রিয় সার্বভৌম প্রিয় প্রাঙ্গণ!
জামসেদ ওয়াজেদ
নক্ষত্রের ফুল
হৃদয়ে স্বদেশ ছিল আর ছিল শুধু জনগণ
এ সবুজ মানচিত্র সংরক্ষণে যার অবদান
জাতি তাকে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে পাহাড় সমান
বিদায় কথাটি যেন ভেঙে দেয় বিশ কোটি মন
নিজের স্বার্থের কথা কখনো তো ভাবতে শুনিনি
এ শীতার্ত জনপদে জনগণ শোক এ বিহ্বল
প্রতিটি মুখের পানে তাকালেই চোখ ছলছল
আমরা বাঙালি জাতি আপনার কাছে তাই ঋণী
অসীম অনন্তজুড়ে সুখী হোন হে প্রিয় জননী
আপস ছিল না তাই বেঁচে আছে পুরো এক জাতি
কেউবা কৃষক তারা কেউ কেউ জেলে কিংবা তাঁতি
আপনি তো আমাদের প্রিয়জন মমতার খনি।
আমরা তো হারিয়েছি তরতাজা নক্ষত্রের ফুল
আজ এ ব্যথিত দিনে শোকাতুর আমের মুকুল।
ফরিদ সাইদ
আপসহীন এক মহাকাব্য
ছোট্ট পুতুল বধূ হয়ে এলেন নতুন ঘরে
দেশের টানে পথে এলেন শহীদ জিয়ার পরে।
এ পথ বড়ই কঠিন জেনেও- সুখের আবাস ফেলে
স্বৈরাচারীর রোষানলে বন্দী থাকেন জেলে।
মেঘের সতেজ শ্যামল ছায়ায় পাখপাখালির গানে
নানান মতের এক সমাবেশ শীতল শোভা আনে।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া স্রোতের বেগে ছোটেন
এমনি তিনি দেশমাতৃকার মাতা হয়ে ওঠেন।
ঝড়ের বেগে আঘাত হানে দুষ্ট দানব হায়েনা
দেশ গঠনের ঝাণ্ডা হাতে আপস করা যায় না!
আন্দোলনের বাঁকে বাঁকে প্রবল বাধা আসে
বেগম জিয়ার কাব্যকথায় পদ্মা মেঘনা হাসে।
শোকের পাথর বুকে নিয়ে গণতন্ত্রের জন্য
আপসহীন এক মহাকাব্যের সাফল্য অনন্য।
মাহবুব হাসান
স্বাধীনতার অক্সিজেন
আমাদের স্বাধীনতার রাজনীতি কী?
সে কি সীমান্ত উদ্ধার?
নাকি চুষে খাওয়া আমের আঁটি? নাকি
মুক্তি-নাজাত আর মোক্ষ লাভের তরণী
নাকি পুলসিরাত
ট্রিক্স নদী পার হলেই শস্যময় পৃথিবী,
অফুরন্ত ফলমূল,
সুরার নহর, রূপের বহর
ফুল্ল ফুলের সুবাসে ভাসাতে ভাসাতে বেহেশত!
তোমার মর্মে ঢুকে যাবে অশরীরী নটনটী
ছায়ানট রবীন্দ্রসঙ্গীতের মিহিন সুরে
ধবধবে শাদা বরফের মতো দাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবে
নির্বাণ জীবন
তাহাদের কে না চায় ওই মুক্তি! ধর্মযুদ্ধ
কে না চায় সেই যুদ্ধগ্রস্ত উন্মাদনা?
যুদ্ধের নোলক! পরে আমরা তো হেজিমনির রসুন খেয়ে আত্মাকে টাইট করে বেঁধেছি আমরা!
আমরা কি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তি চেয়েছি?
নাকি স্বাধীনতা চেয়েছি হীরকখচিত?
সীমান্ত পেয়েছি-
তাই কি প্রতিদিন ভারতের বুলেট
ছিন্নভিন্ন করে দেয় ফাতিমার লাশ?
ফেলানীর রক্তাক্ত সকাল পলাশ ফুলের রক্তের ঘ্রাণে বাতাসে দুলতে থাকা পতাকা কি সে?
সীমানা পাওয়ার লোভ তো লাশের স্তূপ,
একজন জেনারেলের হীরকখচিত তারকার উদ্বোধন!
আমাদের বিবেক খুলবে খাচ্ছে আজ
ঈশ্বরের ঈগল?
আমি স্বাধীনতার বিজয় পতাকার মতোই দুমড়ানো লাল আর সবুজ পতপত উড়তে থাকি রৌদ্রালোকিত জমিনে-
কিন্তু শকুন আর ঈগলের চঞ্চু
আমাদের রক্তাক্ত করে প্রতিদিন,
জিয়া তো স্বাধীনতা চেয়েছিল
মোক্ষ অর্জন হয়েছে হাজার বছর আগে
আমাদের বটবৃক্ষে নতুন পাতা ফলিয়াছে ঘন সবুজ ক্লোরোফিল খালেদা জিয়া
আমাদের অক্সিজেন-ফ্যাক্টরিতে জমেছে প্রচুর রসদ গণতন্ত্র অভিযাত্রার!
সন্দেহের নিখিল ভরেছে অবিশ্বাসের,
তবু হায়! শ্বাস ও প্রশ্বাসে বহুতর খরতাপের লীলাখেলা,
বাকুমবুকুম পায়রার মতো ফুলিয়েছে সুরেলা সঙ্গীত
ডাক্তার বলেছে এটি পরাধীনতার গীত!
আমি স্বাধীন, প্রভু হে! শব্দের কোলাহলে ধ্বস্ত
শব্দ-দূষণের দৈত্যের সংলাপে! তক্ত!! গাজী, বীর! পৃথিবীর!!
হুসাইন আলমগীর
বিভান্বিতা
আলোর নিভে যাওয়া মানে ধ্রুব তারা হয়ে জ্বলে থাকা-- মহাকাল, কারো কারো চলে যাওয়া প্রস্থান নয়, নতুন বিভায় ফিরে আসা ফের
কারো কারো চলে যাওয়া মানে, নবায়ন আবেগের!
সূর্যও তো প্রতিদিন চলে যায় আঁধারের হৃৎপিণ্ড চিরে-- আবার ফেরে--নতুন করে--জ্বলে--নতুন বিভায়, আলো শক্তি--অবিনাশী, চির ধ্বংসহীন--আঁধারের আজন্ম সতীন।
আপনার চলে যাওয়া মানেই চলে যাওয়া নয়
আপনারা চলে যাওয়া মানেই জ্বলজ্বল জ্বলে থাকা
আপনার চলে যাওয়া মানেই ফিরে ফিরে আসা
অন্ধকার ভেদ করে, যেভাবে পূর্ণিমা আসে
আপনার চলে যাওয়া মানেই ফিরে ফিরে আসা
ঘন কুয়াশার দেয়াল বিদীর্ণ করে
প্রোজ্জ্ব¡ল সূর্য যেভাবে আসে
প্রতিদিন ভোরে, এই বাংলার জানালার পাশে
সতর্ক দোয়েল
আপনি ডেকে যাবেন--ঘুমন্ত শহর
কুয়াশাজড়ানো ভোরে, আপনি উষ্ণতা ছড়াবেন
ফসলের মাঠে... কূট অন্ধকারে--সফেন পূর্ণিমা হবেন, এখানে আমাদের এই স্তব্ধ আঙ্গিনায়
কী আশ্চর্য সরল সাহসী হাত আপনার--অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠে আপসহীন
অন্ধকার বরাবরই আপনার ঘোর প্রতিপক্ষ
বিভান্বিতা, আলো শক্তি, অবিনাশী, চির ধ্বংসহীন--আঁধারের আজন্ম সতীন।
আপনার চলে যাওয়া মানে আমাদের সমগ্র উঠোনজুড়ে জ্বলে থাকা চাঁদ--আপসহীন।