মুন্সীগঞ্জে ভোটের দ্বন্দ্ব
বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী জোটের কৌশলী অবস্থান
Printed Edition
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ জেলার তিনটি আসন এবার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টির পরও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভোটের ফলাফলকে জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ-১ ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেয়ায় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজধানী ঢাকার সাথে সংযুক্ত মুন্সীগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে : মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর ও সিরাজদিখান), মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং) এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ (জেলা সদর ও গজারিয়া)। জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি থাকলেও এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও স্থানীয় নেতাদের অবস্থান নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি তিন ভাগে বিভাজিত। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মো: আব্দুল্লাহ। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এ আসনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকলেও এবার দুইজন বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে দলটি কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারে। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মীর সরফত আলী সপু এবং শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমিন আলী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মমিন আলী ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী অধ্যাপক এ কে এম ফখরুদ্দীন রাজী। জোটের সমর্থন নিয়ে তিনি মাঠে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, জামায়াতের এই শক্ত অবস্থান তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ মো: আব্দুল্লাহ বলেন, দলের মনোনয়নবঞ্চিত নেতা-নেত্রীরা যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, তবে হাইকমান্ড ব্যবস্থা নেবে। ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত করতে আমাকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী মমিন আলী জানান, গত ১৭ বছরের ত্যাগ ও নির্যাতনের বিষয়টি মূল্যায়ন না করেই এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। নির্বাচনী বিশ্লেষকরা বলছেন, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির তিন ভাগ ভোট নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করতে পারে। দলীয় মনোবল বজায় রাখতে হলে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন।
মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজং) আসনে বিএনপি প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ। প্রথমে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা; কিন্তু আকস্মিক অসুস্থতার কারণে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ায় মনোনয়ন পরিবর্তন করা হয়। এ আসনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। ফলে আব্দুস সালাম আজাদ অনেকটা নির্ভার থেকে নির্বাচনী মাঠ গোছাচ্ছেন। তার প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক এ বি এম ফজলুল করিম। নির্বাচনী তপসিল ঘোষণার পর তিনি মাঠে সরব রয়েছেন। তিনি জয়যুক্ত হবেন বলে বেশ আশাবাদী। বিশ্লেষকরা বলছেন, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও জেলার পুরো নির্বাচনী প্রভাব অন্য দুই আসনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ : সদর আসনেও বিএনপিতে রয়েছে অন্তর্কলহ। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হলেন কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন। এই আসনে বিএনপির আরেক নেতা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো: মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়বেন। সদর আসনের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। গত ২৫ বছর এই আসনে এমপি ছিলেন মহিউদ্দিনের বড় ভাই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আব্দুল হাই। তার নেতৃত্বে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু দলের হাইকমান্ডের মনোনয়ন ঘোষণা অন্যভাবে হওয়ায় অন্তর্কলহ প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস থেকে নুর হোসেন নুরানী। জানা গেছে, জোট এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে বিএনপির বিদ্রোহের সুবিধা নিতে সদা সচেষ্ট। ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকও টার্গেট করছেন নুর হোসেন নুরানী। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান ফকির বলেন, ‘৭৮টি ওয়ার্ড কমিটির মধ্যে ৭৪ জন মো: মহিউদ্দিনকে সমর্থন দিয়েছেন। তারপরও হাইকমান্ড অন্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তে বিরোধী নেতারা বিক্ষোভ তো করবেনই।’