যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তায় মার খেল বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা
অনিশ্চয়তার মধ্যেও মুনাফায় ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি সিটি ব্যাংকের
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বিরতির খবরে বিশে^র পুঁজিবাজারগুলো যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তা ঘটেনি। দেশের পুঁজিবাজারও তার ব্যতিক্রম নয়। আর এভাবেই বড় ধরনের মার খেয়েছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা। গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির বার্তা পেয়ে পরদিন ৮ এপ্রিল দেশের দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন ও সূচকের রেকর্ড পরিমাণ উন্নতি ঘটে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলি বাহিনী কর্তৃক লেবাননে উপর্যুপরি হামলার ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আবারো সারা বিশে^র মতো দেশের পুঁজিবাজারও নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হয়। ৯ এপ্রিল বড় ধরনের সূচক হারায় দেশের দুই পুঁজিবাজার।
বিদায়ী সপ্তাহে (৫ এপ্রিল-৯ এপ্রিল) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। রোববার ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৮৫ ও ৩ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। যুদ্ধের বিস্তৃতি বৃদ্ধি পাওয়ায় সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্বা খায় পুঁজিবাজার। তবে পরবর্তি তিনটি কর্মদিবসে হারাােনা সূচকের কিছুটা ফির পায় বাজারগুলো। এর পরই পাওয়া যায় যুদ্ধবিরতির বার্তা। ৮ এপ্রিল ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১৬১ পয়েন্টের বেশি। কিন্তু যুদ্ধ বিরতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরদিন আবারো হোঁচট খায় পুঁজিবাজার। ওই দিন প্রধান সূচকটির ৬০ পয়েন্ট হারায় ডিএসই।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংবেদনশীল পুঁজিবাজারে এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধই প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা সফলতার মুখ দেখলেই পুঁজিবাজারগুলো ফের ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে। আর তা না হলে আরো কিছুদিন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার হতে হবে বিনিয়োগকারীদের।
গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের সামান্যই উন্নতি ঘটে। ৮ এপ্রিল ডিএসই ৯৯১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করলে সপ্তাহের মোট লেনদেনের উন্নতি ঘটে। এ সময় ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৩৪৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৩৪১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এ সময় বাজারটির গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৬৬৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা যা আগের সপ্তাহে ছিল ৬৬৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
এ দিকে অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক পিএলসি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে। ব্যাংকটি সমন্বিতভাবে ১,৩২৪ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের ১,০১৪ কোটি টাকার তুলনায় ৩১% বেশি। এককভাবে ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ১,৩০৬ কোটি টাকা এবং এর চার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে আরো ১৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা যোগ করেছে। এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে শক্তিশালী আয় বৃদ্ধি, শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফল হিসেবে। ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কোম্পানিটির পর্ষদ সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছর ঋণ থেকে সুদ আয় ২৪% বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৪০৩ কোটি টাকা থেকে ৫,৪৫২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি তাদের সম্পদের গুণগত মানও উন্নত করেছে। শ্রেণীকৃত ঋণ (এনপিএল) অনুপাত ২০২৫ সালের শেষে ২.৫%-এ নেমে এসেছে, যা আগের বছরের ৩.৭% থেকে কম। এ ছাড়া অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও ব্যাংকটি আমানতের খরচ ৫.৫% পর্যায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও গত বছর গ্রাহক আমানত ও তহবিল ব্যয় খরচ বেড়েছে, ব্যাংক সেই ব্যয় বৃদ্ধি সামলেছে সরকারি সিকিউরিটিজে কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে। ফলে ৪,৮৮৮ কোটি টাকার মোট পরিচালন আয়ের মধ্যে এই বিনিয়োগের অবদান ২৬%-এ পৌঁছেছে। তহবিল ব্যয় সমন্বয়ের পর নিট বিনিয়োগ আয় দাঁড়িয়েছে ১,২৭৪ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে ব্যাংকটি দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮.০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করেছিল। ফলে ট্রেড সার্ভিস থেকে কমিশন ও ফি আয় হয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা, আর রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা থেকে এসেছে ৪৭১ কোটি টাকা। ফলে মোট ফি ও কমিশন আয় দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট পরিচালন আয়ের ২১%।
ব্যয় দক্ষতা এ ব্যাংকের অন্যতম শক্তি। মুদ্রাস্ফীতি এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব সত্ত্বেও ব্যাংকটি তাদের আয়-ব্যয় অনুপাত ৪৪%-এ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ৪,৮৮৮ কোটি টাকার মোট আয়ের বিপরীতে গত বছর মোট ব্যয় হয়েছে ২,১৬০ কোটি টাকা।
সূচক ও লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন দশমিক ১১ শতাংশ হ্রাস পায়। ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন বৃহস্পতিবার লেনদেনশেষে ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকায় ঠেকে।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। গত সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ২৬ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে কোম্পানিটির যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। গড়ে ২৩ কোটি টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে একমি পেস্টিসাইড উঠে আসে সপ্তাহিক লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে লাভেলো আইসক্রিম, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, টেকনোড্রাগস, সিটি র্ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ।