ভিসা সহজ ও ডিজেল সরবরাহ বাড়াতে সম্মত হয়েছে ভারত
দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তেলমন্ত্রীর সাথে খলিলুরের বৈঠক
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশীদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। এ ছাড়া ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে ভারত।
গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ পুরীর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন দিনের সফরে গত মঙ্গলবার দিল্লিতে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান ভারতের যুগ্ম সচিব বি সাইয়াম ও বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। একই রাতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সৌজন্যে নৈশভোজের আয়োজন করেন।
অজিত দোভাল ও এস জয়শঙ্করের সাথে আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছেন। ড. রহমান ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেফতার করায় ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান। উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
আলোচনায় জয়শঙ্কর বলেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশীদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।
ড. রহমান সম্প্রতি ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের জন্য মন্ত্রী হরদীপ পুরীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ডিজেল ও সারের সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ করেন। মন্ত্রী পুরী ইঙ্গিত দেন, ভারত সরকার এই অনুরোধটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
আলোচনায় উভয়পক্ষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে। তারা গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।
ড. রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেছে। পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয় পক্ষের সুবিধার ভিত্তিতে বিএনপি এই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে।
দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে খলিলুর রহমানের সাথে বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক্স হ্যান্ডেলে দেয়া বার্তায় বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও তার প্রতিনিধিদলকে আতিথ্য দিতে পেরে আনন্দিত। আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেছি। এ ছাড়াও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলী নিয়ে মতবিনিময় করেছি। আমরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গতকাল সকালে ভারতের কয়েকজন সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সাথে প্রাতঃরাশ বৈঠকে যোগ দেন।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর এটাই বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রী পর্যায়ে ভারতে প্রথম সফর। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সম্প্রতি এই স্থবির সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে দুই দেশের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে আবারো ভিসা দেয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগরতলা ও শিলিগুড়ির হোটেলগুলোতে বাংলাদেশীদের থাকার ওপর ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। আবারো চালু হয়েছে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস। বাংলাদেশীদের জন্য চিকিৎসা ভিসা সহজতর করেছে ভারত। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনের পর পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসাও চালু হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকাকালে খলিলুর রহমানের সাথে দিল্লিতে অজিত দোভালের বৈঠক হয়েছিল। আর এবার হয়েছে বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। বৈঠকটি সম্পর্কে দুই পক্ষ বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য বরাবরই বাংলাদেশের সহায়তা চেয়ে এসেছে। বাংলাদেশও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিক হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চায়।
ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৯ এপ্রিল দিল্লি থেকে মরিশাসে রওনা হবেন। তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে একই ফ্লাইটে মরিশাস যাবেন। ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পোর্ট লুইসে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সম্মেলনে ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।