জুলাইয়ে অস্ত্র হাতে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন শামীম ওসমান : প্রসিকিউশন
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান নিজে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন। গতাকল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানির সময় এই দাবি করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তিনি এ মামলায় আনা তিনটি অভিযোগ তুলে ধরে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন জানান। তবে ডিসচার্জের জন্য সময় চান আসামিপক্ষ। পরে আসামিপক্ষে শুনানির জন্য আগামী ২৩ এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এ প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর পালোয়ান বলেন, ছাত্র-জনতাকে হত্যার জন্য পুরো পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন শামীম ওসমান। তিনি নিজেও অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি করেছেন। তার একটি অডিও ক্লিপ ট্রাইব্যুনালকে শোনানো হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে নিজের সশস্ত্রবাহিনী তথা এ মামলার ১১ আসামিকে সাথে রেখে নারায়ণগঞ্জে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিলেন সাবেক এই সাংসদ।
তিনি বলেন, আমরা এ মামলায় ১৮টি ভিডিও ফুটেজ, অডিও প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার দালালিক নথিপত্র দাখিল করেছি। ৬১ জন চাক্ষুষ সাক্ষীর তালিকা আমরা জমা দিয়েছি। এসব প্রমাণাদির ভিত্তিতে আমরা ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হবো বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছি।
এ মামলায় শামীম ওসমান ছাড়াও তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। তবে সবাই পলাতক রয়েছেন। তাদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দিয়েছেন আদালত।
প্রসিকিউশনের আনা তিনটির প্রথম অভিযোগ হলো- ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল, ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী ২১ জুলাই ফাতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়। তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্টে বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যা করা হয়।
এই তিন অভিযোগে ১২ আসামির বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১।
এবার গুমের মামলায় গ্রেফতার ফজলে করিম-জিয়াউল
গুমসহ হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ দুজনকে গ্রেফতার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে একদিন করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিত ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানিতে নিজের পদবি ও চাকরির অবস্থা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান। মামলার নথিতে তাকে ‘বরখাস্ত’ হিসেবে উল্লেখ করায় উষ্মা প্রকাশ করে কাঠগড়া থেকে দাঁড়িয়ে তিনি আদালতের কাছে আরজি জানান, তিনি বরখাস্ত নন বরং একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এদিন গুমসহ হত্যার ঘটনায় করা একটি মামলায় জিয়াউল আহসানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি এই মামলায় ফজলে করিম ও জিয়াউলকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান। পরে ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
শুনানিকালে অভিযোগের নথিটি কাঠগড়ায় থাকা জিয়াউলকে দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের অনুমতি চান আইনজীবী নাজনীন নাহার। অনুমতি পেয়ে নথিটি হাতে নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে দেখেন সাবেক এই সেনাকর্মকর্তা।
অভিযোগ পড়ার একপর্যায়ে কথা বলার জন্য কাঠগড়া থেকে দাঁড়িয়ে যান জিয়াউল আহসান। তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি বরখাস্ত নই। কিন্তু এখানে বরখাস্ত লেখা হয়েছে। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বরখাস্ত লেখা হয়।’ তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, যখনই কোনো আসামি আইনজীবী নিয়োগ দেন, তখন তার হয়ে আইনজীবীই কথা বলবেন। আসামি চুপ থাকবেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগামী ২১ জুন এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সুবিধাজনক সময়ে তাদের এক দিন করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, জিয়াউল আহসান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে। তবে বরখাস্ত লেখায় তিনি আপত্তি জানিয়েছেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু জাফরকে তুলে নিয়ে গুমের পর হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ফজলে করিম চৌধুরী ও জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।