আম রফতানিতে আশার আলো বিমানভাড়া কমানোই চ্যালেঞ্জ
নতুন দেশ হিসেবে ২৮ মে চীনের বাজারে যাবে বাংলাদেশের সুস্বাদু আম
Printed Edition
আম রফতানিতে চাষি ও রফতানিকারকদের মধ্যে আশার আলো জেগেছে। বিশেষ করে চীন বড় পরিসরে বাংলাদেশ থেকে আম নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন তারা। আগামী ২৮ মে প্রথমবারের মতো আম রফতানি শুরু হচ্ছে চীনে। আপাতত ৫০ টন যাবে। আশা করা হচ্ছে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। তবে, আগের মতোই দুশ্চিন্তা একটাই, আম পরিবহনে অতিরিক্ত বিমানভাড়া। রফতানিকারকরা বলছেন, সরকার কার্গো বিমান নিশ্চিত করতে পারলে শুধু চীন নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই আম রফতানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়ানো সম্ভব। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পিডি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ২৪-২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হলেও রফতানির পরিমাণ খুবই কম। আম উৎপাদনে বিশ্বে নবম হলেও রফতানিতে বেশ পিছিয়ে আছি আমরা। গত বছর বাংলাদেশের আম ৩৮টি দেশে রফতানি হয়েছে, এবার চীনসহ আরো বেশ কযেক দেশ যুক্ত হবে। এ বছর ৩০-৪০ হাজার টন রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা রফতানি উপযোগী আম উৎপাদন করতে পারলেও ফরোয়ার্ড লিংকেজে কিছু সমস্যা। এয়ার ফেয়ার বেশি এবং এয়ার স্পেস সঙ্কটের কারণে কাক্সিক্ষত মাত্রায় আম রফতানি করা যাচ্ছে না।
বিগত ৮ বছরের আম উৎপাদন ও রফতানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে, ২৭ লাখ টনেরও বেশি। আর ওই বছর সবচেয়ে বেশি তিন হাজার ১০০ টন আম রফতানি হয়েছিল। তবে, পরের বছরই (২০২৩-২৪ অর্থবছর) আম উৎপাদন কমে সাড়ে ২৪ লাখ টনে নামে। আর রফতানিও প্রায় অর্ধেক কমে এক হাজার ৩২১ টনে নামে। আবহাওয়া অনুকূল না হওয়ায় গত বছরের মতো এ বছরও আম উৎপাদন কম হওয়ার কথা বলছেন কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা। এ বছর প্রায় ২৩ লাখ টন আম উৎপাদন হতে পারে। তবে, রফতানির পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়বে বলেই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপে আম পাঠাতে প্রতি কেজি ৩৫০-৩৮০ টাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ২০০-২২০ টাকা খরচ হয়, যা অনেক বিদেশী ক্রেতাকে নিরুৎসাহিত করে। তবে, চীনে পরিবহন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক সাশ্রয়ী হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বেও প্রায় ৩৮টি দেশে আম রফতানি হচ্ছে। এর মধ্যে এ বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে চীন।
রাজিয়া সুলতানা নামের এক রফতানিকারকের মতে ভারত, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড আম রফতানির জন্য বিশেষ কার্গো ফ্লাইট ব্যবহার করে। অথচ বাংলাদেশকে যাত্রীবাহী ফ্লাইটে নির্ভর করতে হয়। এতে করে প্রতি কেজিতে আমাদের খরচ দেড় ডলার বেশি পড়ে। আমাদের আমের স্বাদ ভালো হলেও, এখানেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
সংশ্লিষ্ট বলছেন, চীন প্রতি বছর প্রায় চার লাখ টন আম আমদানি করে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন থেকে মূলত এই আম নেয় তারা। রফতানিকারকরা বলছেন, মান বজায় রাখা গেলে এবং কার্গো বিমান নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এই বাজারে বড় প্রতিযোগী হবে।
রফতানিকারকদের অভিযোগ, কৃষিপণ্য রফতানির জন্য প্যাকিং হাউজ করা হয়েছে রাজধানীর শ্যামপুরে। অথচ চালান যায় বিমানবন্দর থেকে। একই জায়গায় বা কাছাকাছি এটি থাকলে খরচ অনেক কমতো। উপরন্তু রফতানি প্রণোদনাও ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
এ দিকে গতকাল বুধবার রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে চীনে আম রফতানি এবং কৃষি খাত নিয়ে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা করতে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।
তিনি বলেন, চীন সরকারের আগ্রহে দেশটিতে আম রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করছে বাংলাদেশ। আগামী ২৮ মে আমের প্রথম চালান যাবে সে দেশে। কৃষিসচিব বলেন, চীনে আম রফতানির মধ্যে দিয়ে কৃষিপণ্য রফতানিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। এবার আনুমানিক ৫০ টন আম চীনে রফতানি হবে। পর্যায়ক্রমে এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য আমরা কাজ করছি। আমের পাশাপাশি কাঁঠাল ও অন্যান্য ফল রফতানির জন্য সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, চীনসহ অন্যান্য দেশে রফতানির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রণোদনার মাধ্যমে আম চাষে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত বিমানভাড়া দিয়েও রফতানিকারকরা আমসহ কৃষিপণ্য পাঠাতে পারেন না- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কৃষি সচিব বলেন, এটা একটা বাস্তব কথা। আমাদের রফতানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো এই বিমানভাড়া বেশি এবং কার্গো বিমানের ব্যবস্থা না থাকা। দ্বিতীয়ত হলো একেক দেশে একেক রকম কোয়ারেন্টাইন রিকুয়ারমেন্ট রয়েছে, সেটা। রিকুয়ারমেন্টটা হয়তো আমাদের (কৃষি মন্ত্রণালয়) মতো করে ম্যানেজ করতে পারব, কিন্তু বিমানের বিষয়টি একটা চ্যালেঞ্জিং। এটা নিয়ে নিয়মিত কাজ করছি। আজকে দুইজন এসেছিলেন, কিভাবে আমরা পোর্টেশিয়াল মার্কেটগুলো কার্গো সাপোর্ট কিভাবে দিতে পারে আলোচনা হয়েছে। চীনের সাথে যদি আমাদের চাহিদা (আম) বাড়ে তাহলে সে রকম (কার্গো) প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা যাবো- এটা আমাদের সাথে কথা হয়েছে। আরো কোথায় কোথায় পোর্টেনশিয়াল মার্কেট রয়েছে, যেখানে কার্গোসেবা প্রয়োজন, সেটার উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে- এটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বিমানের স্পেস অনেক সময় পাওয়া যায় না। এমনও হয়, লাগেজ বিমানবন্দরে নেয়া হয়েছে; কিন্তু বিমানে স্পেস না থাকায় কৃষিপণ্যগুলো আর নেয়া যায় না। বাংলাদেশ বিমান, সিভিল এভিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি। চ্যালেঞ্জ যেগুলো আছে সেগুলো আমরা মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি।
কৃষিসচিব জানান, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় কৃষি উৎপাদনকে টেকসই ও যুগোপযোগী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চয়তা দিতে এ পরিকল্পনার গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেই এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, দেশের কৃষিকে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠানের সেবাগুলো একটি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) আওতায় আনা হবে। দেশের প্রতিটি ভূমি মৌজাকে ডাটাবেজের আওতায় এনে সার, বীজ, বালাইনাশক,সেচ, ফসল বৈচিত্র্য, আবহাওয়া, রোগবালাই কৃষি সংশ্লিষ্ট সব তথ্য সন্নিবেশিত একটি মোবাইল এপস ‘খামারি’ চালু করা হচ্ছে। এ অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষক তার জমিতে কোন মৌসুমে কি ফসল চাষ করতে হবে তার পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফসল উঠানো পর্যন্ত সব তথ্য ও সেবা পাবে। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষিত নারী ও তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করবে।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো: মাহমুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।