প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিয়েও চাকরি নিয়ে শঙ্কায় ৩ শতাধিক শিক্ষক
Printed Edition
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল রাখতে দীর্ঘ আট বছর সেবা দিয়েছেন এক হাজারের বেশি অধিক বিষয়ভিত্তিক দক্ষ রিসোর্স শিক্ষক। কিন্তু তাদের সেই সেবা এখন যেন নিজেদের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চল কিংবা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অতি জরুরি বিষয় ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞান পড়ানো রিসোর্স শিক্ষকরাই (আরটি) এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন। চাকরি স্থায়ীকরণের কোনো আশ্বাস না পেয়ে অনেকে চলে গেছেন অন্য পেশায়। তবে এখনো কম বেতনে শিক্ষকতা অব্যাহত রেখেছেন তিন শতাধিক শিক্ষক। তারা দাবি জানিয়েছেন সরকারের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে যেন তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে দেশের ১৪০টি উপজেলায় ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ)’-এর আওতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও অবহেলিত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে সরকারি বিধি মোতাবেক এক হাজার ‘রিসোর্স টিচার’ নিয়োগ দেয়া হয়। যোগ্যতা হিসেবে চাওয়া হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বয়স ধরা হয় ৩০ বছর।
রিসোর্স টিচার্সদের মূল দায়িত্ব ছিল ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা এবং পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং উপেক্ষিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা। রিসোর্স টিচার নিয়োগের ফলে উল্লেখিত বিষয়গুলোতে পাসের হার বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে সফলতা অর্জন করছে। এসব শিক্ষকের মধ্যে অধিকাংশ রিসোর্স পরবর্তী সময়ে বি.এড ডিগ্রিও অর্জন করেছেন।
তাদের অনেকেই এই প্রতিবেদককে বলেন, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে আমরা দিনের পর দিন নিরলসভাবে কাজ করেছি। অনেক জায়গায় স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় আমরাই প্রতিষ্ঠানগুলোর একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছি। অথচ দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে একই দায়িত্ব পালন করলেও আজও আমাদের চাকরি অস্থায়ী রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট দফতরের রিপোর্টেও রিসোর্স টিচার্সদের কার্যক্রমে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় এবং চাকরি স্থায়ী করার জন্য সুপারিশ করা হয়।
এ দিকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় সরকার আরটিদের এমপিওভুক্ত করার একটি পরিকল্পনাও নিয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। আজ যখন সেসিপ প্রজেক্টের অধীন অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর জাতীয়করণ প্রক্রিয়া চলম.ান, তখন রিসোর্স টিচাররা রয়েছেন গভীর অনিশ্চয়তায়। দেশের প্রয়োজনে যে শিক্ষকরা অনেক বড় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছেন, তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কায় পড়েছেন। তাদের দাবি কর্মস্থলের বাস্তবতা, অবদান ও দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরি কেন নিয়মিতকরণের বাইরে থাকবে? তাদের দীর্ঘ শ্রম ও অবদান উপেক্ষিত থাকবে কেন?
যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, উপদেষ্টা পরিষদ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা বলছে। এমতাবস্থায় রিসোর্স শিক্ষকদের জোর দাবি তাদের চাকরি যেন বিশেষ বিবেচনায় স্থায়ী করা হয়। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যেহেতু সেসিপের প্রজেক্টের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত। তাই এর পর এসব শিক্ষকের ভবিষ্যৎ কী হবে?
শিক্ষকরা আরো জানান, আজ যখন শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন ও মানসম্পন্ন পাঠদানের কথা বলা হচ্ছে, তখন আমরা যারা এ দায়িত্ব পালন করছি তাদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই সেবামূলক মহৎ উদ্যোগে স্থবিরতা আসতে পারে, যা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের দাবি সরকার ও সংশ্লিষ্ট দফতর যেন দ্রুতই চাকরি স্থায়ীকরণে পদক্ষেপ নেয়।