ত্রাণকেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের ওপর ফের ইসরাইলি হামলা, নিহত ২৭

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • ত্রাণকেন্দ্রে হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ’ : ফলকার তুর্ক
  • স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের
  • হজযাত্রীদের বাসে হামলা
  • গাজায় ৩ ইসরাইলি সেনা নিহত

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন পরিচালিত সাহায্য কেন্দ্রগুলোতে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে গত আট দিনে অন্তত ১০২ জনকে হত্যা করেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আলজাজিরা বলেছে, দক্ষিণ গাজার রাফাহ গভর্নরেটে গতকাল মঙ্গলবার সর্বশেষ এই ধরনের হামলায় কমপক্ষে ২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় ইসরাইলের এই ধরনের হামলাকে ভয়াবহ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরাবৃত্তিমূলক অপরাধ বলে অভিযুক্ত করেছে। গতকালের হামলায় ২৭ জন নিহতের পাশাপাশি আরো ৯০ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভূখণ্ডটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে রাফায় ওই খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে ফিলিস্তিনিদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বিবিসি। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, যারা ‘নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে’ চলে গিয়েছিল, তাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু বলেনি তারা। এর আগে ত্রাণকেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের হতাহতের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসরাইল জানিয়েছিল, উত্তর গাজায় লড়াই চলাকালে তাদের তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন। হামাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরাইল গাজায় নির্বিচার ও নৃশংসভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হামলায় ইতোমধ্যে গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমর্থিত বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) গত সপ্তাহে তাদের প্রথম ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র চালু করেছে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজার বেশির ভাগ মানুষই ইতোমধ্যে নিজের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। জিএইচএফ জাতিসঙ্ঘসহ সেখানে কাজ করা আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে পাশ কাটিয়ে গাজায় ত্রাণ বিতরণ করছে। জাতিসঙ্ঘসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত সাহায্য সংস্থাগুলো তাদের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালা অনুযায়ী নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমর্থিত এই বেসরকারি গোষ্ঠী বলেছে, তারা মঙ্গলবার সকালেই ২১টি ট্রাকে করে খাবার বিতরণ করেছে এবং এ বিতরণকাজ ‘নিরাপদ ও নির্বিঘেœ’ হয়েছে। তবে রাফা এলাকায় ত্রাণ নেয়ার জন্য ভিড় করার সময় আবারো হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গত সোমবার বলেছেন, ত্রাণ নিতে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় তিনি ‘অত্যন্ত মর্মাহত’। এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ত্রাণকেন্দ্রে হামলা যুদ্ধাপরাধ : এদিকে গাজা উপত্যকার ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোর আশপাশে বেসামরিক লোকদের ওপর চালানো ‘মারাত্মক হামলা’কে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্ক। এক বিবৃতিতে তুর্ক বলেন, ‘গাজার ক্ষুধার্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ যখন অল্প পরিমাণে আসা খাদ্যসহায়তা নিতে যাচ্ছে, তখন তাদের ওপর চালানো প্রাণঘাতী হামলা মর্মান্তিক ও অমানবিক।’ তিনি জানান, ‘টানা তিন দিন ধরে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি বিতরণ কেন্দ্রের আশপাশে মানুষ নিহত হচ্ছেন। আজ সকালে আমরা জানতে পেরেছি, সেখানে আরো বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন।’ তুর্ক এসব হামলার প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘এ ধরনের হামলার জন্য যারা দায়ী, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বেসামরিকদের লক্ষ্য করে চালানো হামলা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ।’ ‘ফিলিস্তিনিদের সামনে এখন সবচেয়ে ভয়াবহ দু’টি পথ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, ক্ষুধায় মারা যাওয়া কিংবা সামান্য খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে বোমায় নিহত হওয়া।’ তুর্ক আরো বলেন, ‘ইসরাইলের সামরিকীকৃত মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে সামান্য খাদ্য দেয়া হচ্ছে, তা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা বিতরণের মানদণ্ড লঙ্ঘন করছে, যা নিয়ে জাতিসঙ্ঘ বহুবার সতর্ক করেছে।’

হজযাত্রীদের বাসে হামলা : ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীরের জেনিনে হজযাত্রী বহনকারী বাসে হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলের সেনারা। গত শনিবার জেনিনের বিভিন্ন জায়গায় রেইড দেয় ইসরাইলি সেনারা। ওই সময় তাদের একটি সামরিক যান হজযাত্রীদের বাসে হামলা চালায়। বার্তাসংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, জেনিন গভর্নরেট ভবনের সামনে বাসটিতে হামলা হয়। ওই বাসে থাকা হজযাত্রীরা কারাম সীমান্ত হয়ে পশ্চিমতীর থেকে জর্দানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর জর্দান থেকে সৌদিতে পৌঁছাতেন। বাসে যারা ছিলেন তাদের বেশির ভাগই বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন। ফিলিস্তিনি বার্তাসংস্থা ওয়াফা নিউজ জানিয়েছে, দখলদারদের সামরিক যানটি ইচ্ছাকৃতভাবে হজযাত্রীদের বাসে ধাক্কা দেয়।

জেনিনের ডেপুটি গভর্নর মানসুর আল-সাদি ইসরাইলি সেনাদের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘দখলদারদের যান ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সরাসরি বাসটিতে ধাক্কা দিয়েছে। এটি গভর্নরেট ভবনের সামনে দাঁড়ানো ছিল। বাসের বেশির ভাগ যাত্রী ছিলেন বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। তারা এ ঘটনায় আরো আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়েছেন।’ দখলদার ইসরাইল বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করায় পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিরা জর্দানের বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যান।

ওই দিন জেনিনের সিলাত-আল-হারিসিয়া শহরে সামির জারাদাত নামে এক তরুণের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে আটক করে ইসরাইলি সেনারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শহরটি ছাড়ার আগে দখলদাররা বিস্ফোরক ডিভাইসে বিস্ফোরণ ঘটায়। পশ্চিমতীরের জেনিন, নাবলুসসহ অন্যান্য জায়গায় নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে দখলদাররা। বিশেষ করে ২০২৩ সালে হামাসের অপারেশন আল আকসা ফ্লাডের পর হামলার তীব্রতা বাড়ানো হয়েছে। গাজার পাশাপাশি পশ্চিমতীরেও ইসরাইলি সেনার গণহারে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।

গাজায় ৩ ইসরাইলি সেনা নিহত : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার উত্তরাংশে চলমান সংঘর্ষে তিন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই হামাসের সামরিক শাখা জানায়, গাজার উত্তরে ইসরাইলি বাহিনীর সাথে তাদের ‘তীব্র সংঘর্ষ’ চলছে। হামাসের যোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

পশ্চিমতীরে সাংবাদিকদের ভ্রমণে বাধা

অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর পরিচালকদের পরিকল্পিত সফরে সাংবাদিকদের অধিকৃত পশ্চিমতীরের গ্রামগুলোতে প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। অধিকৃত ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণের ওপর আলোকপাত করা এই চলচ্চিত্রের পরিচালকরা বলেছেন যে তারা সোমবারের সফরে সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যাতে তারা এলাকায় ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সম্পর্কে বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নিতে পারেন।

গাজায় মৃতের সংখ্যা বেড়েছে : আলজাজিরা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২০৮ জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডের ধ্বংসস্তূপ থেকে পূর্ববর্তী ইসরাইলি হামলায় নিহত একজনের লাশও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি বর্বরতায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪,৫১০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ১,২৪,৯০১ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।