গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত : নিহত বেড়ে ৭৩০৪৩
Printed Edition
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা ও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আনাদোলু জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় কয়েক দিন আগে ইসরাইলি হামলায় আহত ১০ বছর বয়সী ওয়ালিদ ইউসুফ আবু জাজার নাসের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। একই এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের দু’টি তাঁবুতে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় ইসলাম হাসান আবু শামালা নামে এক ফিলিস্তিনি নারী নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী ওদাই ইউনুস নিহত হন। আলাদা হামলায় আহত ওয়ালিদ হানিয়াও পরে মারা যান। এর আগে মধ্য গাজার আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে একটি বেসামরিক গাড়িতে ড্রোন হামলায় তিন পুলিশ সদস্যসহ পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের গণহত্যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় কমপক্ষে ৭৩ হাজার ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এক হাজার ৩১ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরো তিন হাজার ৩০৯ জন। মন্ত্রণালয়টি আরো জানায়, ইসরাইলি হামলায় মোট এক লাখ ৭৩ হাজার ৪১৭ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। এদিকে আল-মাগাজি ও দেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি ট্যাংক ও বুলডোজার প্রায় ২০০ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ আরো পশ্চিমে সরিয়ে নিয়ন্ত্রণ এলাকা সম্প্রসারণ করেছে।
পশ্চিম তীরে অভিযান, অগ্নিসংযোগ
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। সালফিতের সারতা শহরে অভিযানের সময় ফিলিস্তিনি মুস্তাফা তাহা খতিবকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে রামাল্লার পূর্বে বুরকা গ্রামে বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় এক হেক্টর জলপাই বাগানে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলার সময় ইসরাইলি সেনারা গ্রামের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়ে কয়েকজন তরুণকে আটক করে, ফলে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এদিকে ইসরাইলের পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি বিল পশ্চিম তীরের প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের ঐতিহ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে দেয়ার পথ তৈরি করছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভূমি অধিগ্রহণ সহজ হবে এবং বসতি সম্প্রসারণ আরো ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে সেবাস্তিয়া এলাকার প্রায় এক হাজার ৮০০ দুনাম জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গাজায় পুনর্গঠন ও যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
গাজা পুনর্গঠন এবং যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কায়রোভিত্তিক গাজা প্রশাসনবিষয়ক জাতীয় কমিটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ক্রিস্টোফ বিগোর সাথে বৈঠক করে পুনর্গঠন পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। কমিটির ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় জরুরি মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও পৌরসেবা পুনরুদ্ধার এবং বেসামরিক নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গাজার পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্য দিকে হামাস জানিয়েছে, তুরস্ক, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, প্রথম ধাপের অসমাপ্ত মানবিক বিষয়গুলো শেষ করে দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল শিগগিরই কায়রো সফর করবে। হামাস জানিয়েছে, গাজা পরিচালনার দায়িত্ব একটি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে তারা প্রস্তুত। তবে সংগঠনটির অভিযোগ, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে মানবিক সহায়তা সীমিত করছে, নতুন এলাকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে এবং হামলা অব্যাহত রাখছে। তাদের মতে, কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া যুদ্ধবিরতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও গাজার পুনর্গঠন সম্ভব হবে না।