বায়তুল্লাহর মেহমানদের মর্যাদা
Printed Edition
মুফতি এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ
হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় ফরজ ইবাদত। ‘হজ’ শব্দটি আরবি; এর আভিধানিক অর্থ কোনো মহান কাজের উদ্দেশ্যে দৃঢ় সঙ্কল্প করা। শরিয়তের পরিভাষায়, নির্ধারিত মাসে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারতসহ মক্কা ও তার সন্নিকটবর্তী মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের ময়দানে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত আমল সুন্নাত তরিকায় ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করাকেই হজ বলা হয়।
নামাজ, রোজা ও জাকাতের মতোই হজও একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন ও সামর্থ্যবান মুসলমান, যিনি নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি হজে যাওয়া-আসা ও সম্পূর্ণ হজ আদায়ের ব্যয় বহনে সক্ষম, তার ওপর হজ পালন করা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘মানুষের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)
বায়তুল্লাহর মেহমানদের মর্যাদা
হজ মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান, মর্যাদা ও সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করে। প্রকৃত হাজী আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসেবে বিবেচিত হন। প্রিয়নবী সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যখন হাজীদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তাদের সালাম দেবে, মুসাফাহা করবে এবং তাদের কাছে নিজের জন্য দোয়া প্রার্থনা করবে; কারণ তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত।’ (বুখারি, মুসলিম)
আরো বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থেকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ আদায় করে, সে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে। (বুখারি, মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ সা: ঘোষণা করেছেন, ‘মাকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (বুখারি, মুসলিম) আর আরাফার দিনের ফজিলত সম্পর্কে তিনি বলেন, এ দিনে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং ফেরেশতাদের সামনে হাজীদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘ওরা কী চায়?’
হজের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সর্বোত্তম আমল কোনটি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তারপর মাবরুর হজ।’ (বুখারি, মুসলিম) অন্য এক হাদিসে এসেছে, ঈমানের পর আল্লাহর পথে জিহাদ, তারপর মাবরুর হজ সর্বোত্তম আমল।
হজ নারীদের জন্যও বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। হজরত আয়েশা রা: জিজ্ঞাসা করলে রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো মাবরুর হজ।’ (বুখারি, মুসলিম)
আরো বর্ণিত হয়েছে, ‘হজ ও উমরা পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। তারা যদি দোয়া করে, আল্লাহ তা কবুল করেন; তারা যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন।’ (তিরমিজি) এক উমরা থেকে আরেক উমরার মধ্যবর্তী গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়, আর মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত। (বুখারি, মুসলিম)
হজের তাৎপর্য ও সতর্কবার্তা
মুমিনের অন্তরে হজ ও ওমরাহর প্রতি গভীর আকাক্সক্ষা থাকে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ আদায় করেন না, তাদের জন্য এটি বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়। হাদিসে কঠোর সতর্কতা উচ্চারিত হয়েছে, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ আদায় করে না, তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। (তিরমিজি)
অতএব, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত জীবনে অন্তত একবার হজ আদায় করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এই মহাসুযোগকে কাজে লাগানো।
উপসংহার
হজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের সমাহার । বাইতুল্লাহর মেহমান হওয়া নিঃসন্দেহে মুমিন জীবনের এক অনন্য সৌভাগ্য।
হে আল্লাহ, আমাদের সবাইকে জীবনে অন্তত একবার হলেও আপনার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আরবি প্রভাষক, বড়হাতিয়া এশাআতুল উলুম ফাজিল মাদরাসা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।