ব্যালেন্স শূন্য ৩৬ হাজার বিও হিসাব : ৩৩১ প্রবাসী নিষ্ক্রিয়

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

চার মাসের পুঁজিবাজার

  • নতুন করে নিষ্ক্রিয় আরো এক হাজার ৮০৪টি বিও
  • স্থানীয় বিনিয়োগকারী চার মাসে বেড়েছে
  • শেয়ার নেই আরো ৩১ হাজার ২৭০টি বিওতে
  • বাজারে আস্থা ফেরাতে পারেনি সরকার ও বিএসইসি : বিশ্লেষকরা

পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় হয়েছে নয় মাস, কিন্তু দেশের স্পর্শকাতর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না। বরং কোনো ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন না আসায় চলতি ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে নতুন করে আরো ৩৬ হাজার ২১২টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব ব্যালেন্স শূন্য বা খালি হয়ে গেছে। অব্যাহত মন্দার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও বাজার ছাড়ছেন। ফলে চার মাসে আরো ৩৩১টি বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছাড়লো। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আগমন বাড়লেও গত চার মাসে নতুন করে আরো ৩১ হাজার ২৭০টি বিও হিসাব শেয়ার শূন্য হয়েছে বলে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা গেছে। আর ঢাকা স্টকের তথ্য বলছে, উত্থান-পতনে দেশের পুঁজিবাজারে চলছে রক্তক্ষরণ। বাজারমূলধন হারানোর পাশাপাশি হারাচ্ছে মূল্যসূচক। কমেছ লেনদেনে টাকার পরিমাণ।

সিডিবিএলের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ৯ মাসেও দেশের পুঁজিবাজারের কোনো অগ্রগতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জিত হয়নি। উল্টো দর পতনের ¯্রােতে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ নিয়ে শঙ্কিত। যদিও গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বিও হিসাব ব্যবহার বা অপারেটিং বিও হিসাব বেড়েছে ৬ হাজারের বেশি। বেড়েছে ব্যালেন্স শূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা। হাসিনা সরকারের পতনের পর দিন ৬ আগস্ট ব্যালেন্স শূন্য বিও হিসাব ছিল তিন লাখ ১০ হাজার ৯১৭টি। অন্তর্বর্তী সরকারের সাত মাসে এই বিও হিসাব আরো ৫১ হাজার ৫৪৯টি ব্যালেন্স শূন্য হওয়ায় ব্যালেন্সহীন বিও এখন তিন লাখ ৬২ হাজার ৪৬৬টিতে পৌঁছেছে। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই শূন্য হওয়া বিওর সংখ্যা বেড়েছে আরো ৩৬ হাজার ২১২টি। ফলে এখন ব্যালেন্স শূন্য বিও হিসাব হলো ৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৩৯টি।

প্রবাসীরা বাজার ছাড়ার স্রোতেই

বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার ছাড়ার এই প্রবণতা ২০২৩ সালের নভেম্বরে সূচনা হয়। গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিনিয়ত তাদের বিও হিসাবের সংখ্যা কমছে বা নিষ্ক্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিদেশী ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ৯ হাজারের বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সেই বাজার ছাড়ার প্রবণতা কমেনি। তবে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরে চার মাসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৬ হাজার ৮৮১টি। আর হাসিনা সরকার পতনের পর দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে বেড়েছে ২১ হাজারের ৩৮৯টি।

বর্তমানে বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব আছে ৪৬ হাজার ৩৬০টি। ২০২৪ সাল শেষে বিদেশী ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৪৬ হাজার ৬৯১টি। অর্থাৎ চলতি বছরে বিদেশী ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ৩৩১টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসেই কমেছে ১৩৪টি। হাসিনা সরকার পতনের সময় বিদেশী ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৪৭ হাজার ৮৪টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার দিন ছিল ৪৭ হাজার ৮১টি। অর্থাৎ বিদেশী ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কমেছে ৭২১টি।

নিষ্ক্রিয় বিও বেড়েছে এক হাজার ৮০৪টি

ব্যবহার হয়নি বিও হিসাব এদের সংখ্যা গত চার মাসে আরো এক হাজার ৮০৪টি বেড়ে এখন এপ্রিল শেষে ৬৮ হাজার ৪৬০টিতে দাঁড়িয়েছে। যেখানে গত ১ জানুয়ারী ছিল ৬৬ হাজার ৬৫৬টি। তবে হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নতুন করে মোট ছয় হাজার ৯১৫টি বিও ব্যবহার হচ্ছে না। ৬ আগস্ট শেয়ার আছে এমন বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৮টি। গত ৯ মাসে শেয়ার ছেড়ে দেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শেয়ার আছে এমন বিও হিসাব কমে এপ্রিল শেষে ১২ লাখ ৪০ হাজার ২৯৭টিতে নেমেছে। যেখানে গত ১ জানুয়ারিতে ছিল ১২ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৯টি। ফলে শুধু এই চার মাসেই কমেছে ৩১ হাজার ২৭০টি বিও।

সিডিবিএলের তথ্য থেকে আরো জানা গেছে, সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে। যার কারণে সক্রিয় বিও হিসাব সংখ্যা বেড়েছে। এই বৃদ্ধির সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এপ্রিল শেষে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯৬টি, যা হাসিনা সরকার পতনের সময় ছিল ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮টি। এ হিসাবে হাসিনা সরকার পতনের পর শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ২১ হাজার ৩৩৮টি। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিও হিসাবে বেড়েছে ২০ হাজার ৫০১টি। অন্তর্বর্তী সরকার যেদিন দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয়, সেদিন বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯৫টি। আর সর্বশেষ এপ্রিল মাসে বেড়েছে ১ হাজার ২৫২টি।

বিদেশীদের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও সরকার পতনের পর স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪টি। আর ২০২৪ সাল শেষে ছিল ১৬ লাখ ১৮ হাজার ২৬২টি। অর্থাৎ চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ৬২টি। আর হাসিনা সরকার পতনের সময় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ১৬ লাখ ৩ হাজার ৮২২টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার দিন ছিল ১৬ লাখ ৪ হাজার ৬৫৮টি। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দেশী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ২০ হাজার ৬৬৬টি। হাসিনা সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেলেও তার আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯৬টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে ৮৪ হাজার ১৫৫টি।

চার মাসে পুঁজিবাজারের চিত্র

এ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বলছে, পতনে রক্তক্ষরণে দেশের পুঁজিবাজারে চরম ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। হতাশায় আক্রান্ত বিনিয়োগকারীরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কোনো উদ্যোগই বাজারে কাজে আসছে না। চলতি বছরের শুরুতে বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা করেছিল কোনো ধরনের সুবাতাস বইবে বাজারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, গত চার মাসে সূচক পতনের পাশাপাশি বাজার থেকে আরো সাত হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা মূলধন থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রধানসূচক ডিএসইএক্স গত ১ জানুয়ারি ছিল ৫ হাজার ২১৮.১৫ পয়েন্ট। পতনের ¯্রােতে চার মাসে ৩০০ দশমিক ২৪ পয়েন্ট সূচক থেকে খোয়া গেছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক উত্থান-পতনে ১১৯ পয়েন্টে বেশি হারিয়েছে।

যা বলছেন বিশ্লেষকরা

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কাজ শুরু করলেও তার সুফল শেয়ারবাজারে দেখা যাচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের মতে, বাজারে আস্থা ফেরাতে এখন সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। চার মাসের টানা মন্দায় ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে এসেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব, ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদহার, মার্জিন ঋণের বিপরীতে শেয়ার বিক্রি (ফোর্সড সেল), নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বের সঙ্কট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ায় বাজারের আজ এই পরিণতি। বর্তমানে বাজারে সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ থেকে কমে মাত্র সাড়ে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিাবাজরের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিবিএ’র সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখনো বাজারে আস্থা ফেরাতে পারেনি সরকার। ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসেনি। গত এক দুই বছরে কোনো আইপিও বা প্রাথমিক শেয়ার আবেদন আসেনি বাজারে। পুঁজিবাজারে কোনো শেয়ার বা ইউনিটের সরবরাহ নেই। তিনি বলেন, সব ধরনের বিনিয়োগকারী ইক্যুইটি ছেড়ে বা বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তারা মানি মার্কেটে চলে গেছে। কিসের আশায় ফিরবে তারা।