ইসরাইলের হামলায় গাজায় দৈনিক হতাহত ১০০ শিশু

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
inter 1
গাজা শহরের ব্যাপটিস্ট হাসপাতালে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত আত্মীয়দের জানাজা পড়ছেন ফিলিস্তিনিরা : ইন্টারনেট
  • ২৪ ঘণ্টায় আরো ৬০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা
  • চিকিৎসকদের হত্যার নতুন ভিডিও প্রকাশ্যে
  • ফিলিস্তিনিদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইল গত ১৮ মার্চ থেকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হামলার পর থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ শিশু হতাহত হচ্ছে, এমনটি জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) প্রধান ফিলিপ লাজারিনি। একই সাথে তিনি আরো বলেন, গাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর। প্রতিদিনের হতাহত সংখ্যা যে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, তা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।

শনিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। এ রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজা এখন একধরনের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস সতর্ক করে জানিয়েছে যে, গাজায় যেসব এলাকাকে নতুন করে ইসরাইলি সামরিক উচ্ছেদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, সেসব এলাকায় থাকা অন্য বন্দীদের অধিকাংশই এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা বলেছে, নতুন অভিযানের কারণে গাজার শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

চিকিৎসকদের ওপর হামলা : ১৫ জন ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষাকর্মীকে হত্যার ঘটনায় নতুন একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। গণকবরে সমাহিত একজন চিকিৎসকের ফোনে পাওয়া ভিডিও প্রমাণে ফিলিস্তিনি সরকারের মিডিয়া অফিস একটি স্বাধীন, আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু করার দাবি জানিয়েছে। অন্য দিকে দক্ষিণ গাজায় খান ইউনুসে ইসরাইলি অব্যাহত অভিযানে সকাল থেকে কমপক্ষে ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে জানায়, আমরা চিকিৎসক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষাকর্মীদের হত্যাকারী এবং ইসরাইলি দখলদার ও যুদ্ধাপরাধীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আনার জন্য জরুরিভাবে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করছি।

গতকাল শনিবার প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে দেখা যায় যে, ইসরাইলি বাহিনী আলোকোজ্জ্বল ও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত রেড ক্রিসেন্ট অ্যাম্বুলেন্স এবং অত্যন্ত প্রতিফলিত ইউনিফর্ম পরা জরুরি চিকিৎসাকর্মী এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করেছে। এর আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছিল যে, জরুরি যানবাহনের বহর হেডলাইট বা জরুরি সঙ্কেত ছাড়াই সৈন্যদের দিকে সন্দেহজনকভাবে অগ্রসর হয়েছিল।

ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত এবং গণকবরে সমাহিত একজন চিকিৎসকের ফোনে পাওয়া ভিডিও প্রমাণটি এর আগে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করেছিল এবং ফিলিস্তিনি মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। এ ব্যাপারে মিডিয়া অফিস বলেছে যে, নতুন ভিডিওটি ইসরাইলি দখলদার সেনাবাহিনীর মিথ্যাচার উন্মোচন করে দিয়েছে।

নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় ইসরাইলি হামলায় ২৪ ঘণ্টায় ৬০ জন নিহত ও ১৬২ জন আহত হয়েছেন। যার ফলে ১৮ মার্চ ইসরাইল পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে গাজা উপত্যকায় এক হাজার ৩০৯ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে শুক্রবার ভোরে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হন। গাজা সিটির আল-আহলি হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, এখন আর আহতদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। হাসপাতালটি দ্রুত অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসরঞ্জাম ও সেবা সরবরাহের ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত।

এ দিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে নতুন করে আক্রমণ শুরুর পর থেকে গাজার বিভিন্ন অঞ্চল দখলের জন্য হুমকি দিয়ে আসছে ইসরাইল। এরই ধারাবাহিকতায় বিমান হামলাও জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে ইসরাইল লেবানন এবং সিরিয়ার ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের সিডন শহরে এক হামলায় একজন হামাস কমান্ডার এবং তার ছেলে নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইল।

আরব নিউজ জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী জানিয়েছে, গাজায় স্থল সেনারা ‘নিরাপত্তা অঞ্চল সম্প্রসারণের জন্য’ শুজাইয়া এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। নাসের হাসপাতালের একটি মেডিক্যাল সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, খান ইউনুসে একটি ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়েছে। এলেনা হেলস টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে এএফপিকে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক এবং প্রতিটি দিক থেকে আমাদের দিকে মৃত্যু আসছে।’ তিনি আরো বলেন, তিনি এবং তার পরিবার শুজাইয়ায় তার বোনের বাড়িতে আটকা পড়েছেন।

ফিলিস্তিনিদের চলাচলে বাধা : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় একের পর এক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে উপত্যকাটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। গতকাল শনিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আলজাজিরা জানিয়েছে, গাজার দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ফিলিস্তিনিদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে এবং কোনো কোনো এলাকা থেকে জোরপূর্বক তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ।

জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত সংস্থা-ওসিএইচএ’র তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ গাজার রাফার বড় একটি অংশ। গত ৩১ মার্চ সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। উত্তরে গাজা নগরীর বিভিন্ন অংশেও এই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে দিতে ইসরাইলি বাহিনীর হুমকির পর গাজাবাসীরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যাচ্ছেন।