পানিতে বহাল কবির বিন আনোয়ার সিন্ডিকেট
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
কয়েকটি অস্ত্রসহ এক বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন শেখ হাসিনার আস্থাভাজন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব থাকাবস্থায় ২০২০ সালে ফেনী জেলায় টেকসই মুহুরী বাঁধ ও নদী ড্রেজিংসহ বন্যা প্রতিরোধে ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন প্রকল্পটিতে নদী খনন, ব্রিজ নির্মাণ, মুহুরী নদীর বাংলাদেশ (ফেনী) অংশে ৯২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ, বাঁকা অংশ সোজাকরণ, লুফ, বেড়িবাঁধে রাস্তা পাকাকরণসহ সব কাজের জন্য বরাদ্দ নেয়া হয় ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের কাজ নিজের পছন্দের লোকদের দেয়ার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে কবির বিন আনোয়ারের বিরুদ্ধে।
পছন্দমতো ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে টাকা আত্মসাতের জন্য মন্ত্রণালয়ের একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন তিনি। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাসহ গুরুত্বপূর্ণ উইংগুলোতে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে আসেন। দীর্ঘ চার বছর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় তাকে। অবসরে যাওয়ার পরও বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৭ম ব্যাচের এই কর্মকর্তা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন।
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে আত্মগোপনে চলে যান সাবেক এই কর্মকর্তা। কিন্তু এখনো আত্মগোপনে থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে তার বসানো কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চললেও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখায় এখনো বহাল রয়েছে কবির বিন আনোয়ারের বসানো কর্মকর্তারা।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের যুগ্মসচিব দীপান্বিতা সাহা। ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল এই কর্মকর্তাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসেন কবির বিন আনোয়ার। এরপর থেকে গত সাত বছর এই মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন দীপান্বিতা। যদিও মাঠ প্রশাসন এবং বিচারবিভাগের কর্মকর্তাদের তিন বছরের অধিক একই কর্মস্থলে না রাখার বিষয়ে মন্ত্রী পরিষদের নির্দেশনা রয়েছে।
২০২১ সালের ৭ জুলাই কবির বিন আনোয়ারের সুপারিশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয় পরিকল্পনা উইংয়ের উপসচিব নাসরিন আলম সাথীকে। এরপর থেকে পাঁচ বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭ ব্যাচের তিনি। এর আগে এই কর্মকর্তা গাজীপুরের সহকারী কমিশনার, এই জেলার কালিয়াকৈরের সহকারী কমিশনার (ভূমি), টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন।
কবির বিন আনোয়ারের হাত ধরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন নেন প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সুজিত হাওলাদার। এই কর্মকর্তাকে ২০২২ সালের ৭ জুন এই মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। এরপর থেকে প্রায় চার বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন তিনি। কবির বিন আনোয়ারের আস্থাভাজন হওয়ায় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলামকে পদায়ন করা হয় ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর। এরপর সাত বছর ধরে তিনি এই মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, কবির বিন আনোয়ারের এই চক্রটি মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইচ্ছে অনুযায়ী ডিপিপি তৈরি এবং সেটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ডিপিপি সংশোধনের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে বছর বছর বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। দ্বীপান্বি^তা সাহা সাবেক ইকোনমিক ক্যাডারের হওয়ায় তিনি পরিকল্পনা কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের বুঝিয়ে এসব প্রকল্প পাশ করিয়ে আনেন। আওয়ামী সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের সাথে এ কর্মকর্তারা ব্যবসায়েও জড়িয়ে পড়েছেন।