এক জিবুতিতে পাঁচ দেশ : ছোট দেশের বড় সামরিক ব্যবসা

Printed Edition

আলজাজিরা

আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতি। জনসংখ্যা ১০ লাখের কম, নেই কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ এই দেশটির উপকূলজুড়েই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘন সামরিক ঘাঁটির সমাহার। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জাপান এবং ইতালির মতো শক্তিশালী দেশগুলো এখানে একে অপরের থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরত্বে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে।

জিবুতির এই গুরুত্বের মূল কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটির পাশেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব-আল-মান্দেব প্রণালী। মাত্র ৩০ কিলোমিটার চওড়া এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং এশিয়া-ইউরোপের ৯০ শতাংশ ইন্টারনেট ডাটা ক্যাবল পরিচালিত হয়। জিবুতির এক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে যেমন তেল, আমাদের কাছে আমাদের ভূগোলই তেমন প্রধান জাতীয় সম্পদ।

ভৌগোলিক গুরুত্ব ও ভাড়া থেকে আয়

যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর পূর্ব আফ্রিকায় স্থায়ী ঘাঁটির সন্ধানে জিবুতিকে বেছে নেয়। ক্যাম্প লেমনিয়ার বর্তমানে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি। অন্য দিকে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সাথে জিবুতির রয়েছে দীর্ঘ দিনের প্রতিরক্ষা চুক্তি। ২০০৯ সালের দিকে সোমালি জলদস্যুদের দাপট বাড়লে জাপান ও ইতালি এখানে ঘাঁটি করে এবং সবশেষে ২০১৭ সালে চীন তাদের প্রথম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে।

এসব ঘাঁটি থেকে জিবুতি বড় অঙ্কের অর্থ আয় করে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বছরে দেয় ৬৫ মিলিয়ন ডলার, ফ্রান্স ৩০ মিলিয়ন এবং চীন ২০ মিলিয়ন ডলার। জাপান ও ইতালি দেয় ৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এছাড়া চীনের বিনিয়োগে ইথিওপিয়ার সাথে রেল যোগাযোগ এবং আধুনিক বন্দর তৈরি হওয়ায় জিবুতির অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে।

সঙ্কটে লোহিত সাগর

২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে লোহিত সাগরে হাউছি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত হামলার কারণে এই সমুদ্রপথ এখন আগের মতো নিরাপদ নেই। ইসরাইল ও হামাস যুদ্ধের প্রভাবে হাউছিরা একের পর এক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে জিবুতির বিকল্প হিসেবে অনেক দেশ এখন সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দরের দিকে নজর দিচ্ছে। সোমালিল্যান্ড ও ইসরাইলের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে জিবুতির প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর গুয়েলেহ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

উন্নয়ন ও বৈষম্য

জিবুতির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়লেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। দেশে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং প্রতি পাঁচজনের একজন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, ঘাঁটির ভাড়া থেকে আসা অর্থ জনগণের কাছে পৌঁছায় না, বরং তা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ব্যবহৃত হয়। প্রেসিডেন্ট গুয়েলেহ ১৯৯৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন এবং বিভিন্ন সময় সংবিধান সংশোধন করে নিজের শাসনকাল দীর্ঘায়িত করেছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকি

বর্তমানে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে জিবুতির ওপর চাপ আরো বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোহিত সাগরের প্রবেশপথে জিবুতির অবস্থান এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই যুদ্ধ জিবুতির অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জিবুতি এতদিন নিজেকে একটি স্থিতিশীল দেশ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে বিশ্বশক্তির নজর কেড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, তবে জিবুতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। তবুও গুয়েলেহর জন্য এই সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখার জুয়া এখন পর্যন্ত কাজ করছে। যুদ্ধে লাশের মিছিল বাড়লেও এবং অনেকে বন্দী হলেও জিবুতির এই কৌশলগত ব্যবসা আপাতত সচল রয়েছে। এমনকি হাউছি বিদ্রোহীরাও এই সমীকরণে একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।