ঋণ নয়, সমাপ্তে অনুদান চায় ৫ শ’ কোটি টাকা
Printed Edition
- সিলেট সিটি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প
- চার বছরের প্রকল্প এখন সাড়ে ৬ বছরে
নির্ধারিত মেয়াদ ও অনুমোদিত খরচে বাংলাদেশে শেষ হয় না উন্নয়ন প্রকল্প। বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। তেমনি একটি প্রকল্প হলো সিলেট সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও অবকাঠামো নির্মাণ (২য় সংশোধিত)। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পটি চার বছরেও শেষ করতে না পারায় এখন খরচ ৫০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর পাঁচ বছর দুই মাসে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৮৯.৫ শতাংশ। আইএমইডি থেকে কয়েক মাস আগে প্রকল্পটি বাতিল করাও হয়। প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার জন্য মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছর বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
সিলেট সিটির প্রধান প্রকৌশলী এ বিষয়ে বলেন, বিগত দিনে অন্যান্য সিটি করপোরেশনে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে, সিলেটে সেটা হয়নি। নতুন করে কিছু ওয়ার্ড যোগ হওয়াতে কাজ বেড়েছে। প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে হলে সরকার ঋণ দিলে সেটা এ সিটির পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। তাই দরকার অনুদান।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশনের পূর্বের আয়তন ছিল ২৬.৫০ বর্গকিলোমিটার। সম্প্রসারিত এলাকা ৫৩ বর্গকিলোমিটার। ৩১ আগস্ট ২০২১ সালে সীমানা সম্প্রসারণের গেজেট প্রকাশিত হয়। সিটি করপোরেশনের সাথে সংযুক্ত হবে বিধায় এর তিন-চার বছর পূর্ণ হতে উক্ত এলাকাগুলোয় এলজিইডির কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। ফলে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে মেরামতের অভাবে বর্ধিত এলাকার অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যখন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয় তখন এর বাস্তবায়ন খরচ ধরা হয় এক হাজার ২৬৬ কোটি পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ এক হাজার ৫২০ কোটি ৫৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব ২৪৫ কোটি ৪৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর প্রকল্পটি ২০২৩ সালের শেষ করার কথা ছিল। এমন গতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছিল যে এরপর দু’বার মেয়াদ বাড়ানো হয়। একবার ২০২৪ সাল পর্যন্ত, পরের বার ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু সাড়ে পাঁচ বছরের প্রকল্পটির পাঁচ বছর দুই মাসে অগ্রগতি মাত্র সাড়ে ৮৯ শতাংশ। এখন বাকি ১১ শতাংশ কাজ সমাপ্ত করার জন্য আরো এক বছর সময় বৃদ্ধি ও খরচ পাঁচ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে রয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হলো, রাস্তা নির্মাণ ২৬৯.১৮ কিলোমিটার, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ একটি, ড্রেন নির্মাণ ৩৬৩.৯২ কিলোমিটার, পানির পাইপলাইন স্থাপন ২৩৬.০৫ কিলোমিটার, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ ৬.৭৩ কিলোমিটার, সড়কবাতি স্থাপন ২৬৩.৫০ কিলোমিটার, বৃক্ষরোপণসহ রোড ডিভাইডার নির্মাণ ২২.৭৫ কিলোমিটার, যন্ত্রপাতি ক্রয় ২৩টি, ভূমিধস রোধে সিসি ব্লক স্থাপন ও আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ ১.১৩ কিলোমিটার, যানবাহন ক্রয় ৫১টি, সীমানা দেয়াল ১২.৭১ কিলোমিটার।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ রাস্তা বিগত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। সম্প্রসারিত এলাকায় রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট না থাকার কারণে বর্ণিত এলাকার নাগরিকগণ ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। সিলেট টিলা প্রকৃতির হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য ড্রেন ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। মহানগরীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত প্রধান প্রধান ২৩টি ছড়া নিয়মিত খননসহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ। বিগত বন্যায় অধিকাংশ রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেরামতের প্রস্তাব আরডিপিপিতে অন্তর্ভুক্তকরণ।
সিটি করপোরেশন থেকে জানা গেছে, গত কয়েক বছরের বন্যায় বিশেষ করে ২০২২ সালে দু’বারের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। চলমান প্রকল্প ও রাজস্ব বাজেট থেকে কিছু মেরামত করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল তাই ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুনভাবে সম্প্রসারিত সিলেট সিটি করপোরেশনের সড়ক, ড্রেন ও কালভার্টগুলো উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবকরণ।
সংস্থাটি থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটি নিয়ে আবার মিটিং হয়। সে সময় তৎকালীন আইএমইডি সচিব প্রকল্পটি বাতিল করেন। বেশ কিছু দিন পর আবার এটাকে পুনঃবিবেচেনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে আবার চিঠি দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারিতে আবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়। তখন পিইসি থেকে ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পটির প্রস্তাবনাকে আবার পুনর্র্গঠন করে পাঠাতে বলা হয়। সে মোতাবেক ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে এবং মেয়াদ আরো এক বছর বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাঠায় সিটি করপোরেশনটি, যা এখন মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায়। সেখান থেকে ছাড়া পেলে একনেকের অনুমোদন পেতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উইং কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত সংশোধিত ডিপিপিতে এসফল্ট রাস্তা, ড্রেন, আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল, সীমানা দেয়াল ইত্যাদি প্রায় ১০টি নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি অঙ্গের ক্ষেত্রে নতুন কাজগুলো সিলেট শহরের কোনো এলাকায় কতটুকু করা হবে তার পরিমাণ ও ব্যয়সহ একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী আরডিপিপিতে যুক্ত করা দরকার। নতুন কাজগুলোর একক ব্যয়ের বিভাজন সংযুক্ত করতে হবে। আরডিপিপির ক্রয় পরিকল্পনায় নতুন কাজের বিবরণ পরীক্ষান্তে দেখা যায় যে, কাজগুলো অনেক ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। ফলে দরপত্র আহ্বানসহ চুক্তি ব্যবস্থাপনায় এ অসুবিধা সৃষ্টি ও কাজ বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানের সাথে গতকাল মুঠোফোনে প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, অনুমোদিত ব্যয় ছিল এক হাজার ২৬৬ কোটি টাকার। পরে আমরা বাড়িয়ে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করি, ২০২৪ সালের মার্চে। মে মাসে আইএমইডি থেকে একটি তদন্ত কমিটি আসে। তারা দেখে নতুন ১৫টি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, কালভার্ট কিছুই নেই। তখন তারা ২০৮ কোটি টাকা কমানোর জন্য পরামর্শ দেয়। ওই কমিটি আড়াই হাজার কোটি টাকায় খরচের সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি। তিনি বলেন, প্রকল্প রিকাস্ট করে একনেকে অনুমোদনের পর শুরু হবে। তবে বরাদ্দ পেতে সময় লাগবে। ফলে মেয়াদ তখন দুই বছর বাড়াতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের খসড়া এডিপিতে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে।