জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারকে ফ্ল্যাট দেয়ার পরিকল্পনা

চার বছরে এই প্রকল্পটি শেষ করতে ৭৬১ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে বলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
July-Andolon
  • শহীদদের সম্মানে বিনামূল্যে এক হাজার ৩৩৬ বর্গফুটের ফ্ল্যাট
  • চার বছরে প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ ৭৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা
  • বর্গমিটার প্রতি খরচ আগের তুলনায় ১০ হাজার টাকা বেশি

সরকার ২০২৪-এ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্য রাজধানীর মিরপুরের ১৪ নম্বরে ৮০৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রতিটি পরিবারকে এক হাজার ৩৩৬ বর্গমিটারের ফ্ল্যাট দেয়া হবে। একই ধরনের ফ্ল্যাট নির্মাণে সমজাতীয় প্রকল্পের তুলনায় এই প্রকল্পে খরচ প্রতি বর্গমিটারে ১০ হাজার টাকা বেশি ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। চার বছরে এই প্রকল্পটি শেষ করতে ৭৬১ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে বলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে। প্রস্তাবনাটি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ১৪ নম্বর সেকশনে মিরপুর পুলিশ লাইন সংলগ্ন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৬০-এর দশকে অধিগ্রহণকৃত নিজস্ব ৫.০৮ একর (কম/বেশি) জমিতে এক হাজার ৩৫৫ বর্গফুট আয়তনের মোট ৮০৪টি আবাসিক ফ্ল্যাটের সংস্থানের কথা বিবেচনা করা হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল ২০২৫ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্প যাচাইয়ের ওপর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শহীদদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য তাদেরকে বিনামূল্যে ফ্ল্যাট প্রদান করে একটি স্থায়ী বাসস্থান প্রদান করার এই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শহীদ ব্যক্তিদের পরিবারের পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে এবং তাদের জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ছয়টি ১৪ তলাবিশিষ্ট আবাসিক ভবনে ৬০০টি এবং ১২টি ১০ তলাবিশিষ্ট আবাসিক ভবনে ২০৪টিসহ মোট ৮০৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপত্য অধিদফতর হতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে কমিউনিটি ভবন, খেলার মাঠ, বহিঃবিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ড্রেন, কালভার্ট ও নিজস্ব গভীর নলকূপ স্থাপনাসহ যাবতীয় সম্ভাব্য সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা রাখার কথা বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রকল্পে কোন খাতে কত ব্যয় : জানা গেছে, ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে, ১৮টি ভবন নির্মাণে খরচ হবে মোট ৬৭৫ কোটি এক লাখ টাকা। ৮০০ কেজি ১২টি প্যাসেঞ্জার লিফট খাতে ১০ কোটি দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা, ১০০০ কেভিএ ছয়টি সাব-স্টেশন নির্মাণে পাঁচ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ২৫০ কেভিএ ১২টি সাব-স্টেশন স্থাপনে সাত কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ১৫০ কেভিএ ছয়টি জেনারেটর কিনতে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা, ৪০ কেভিএ ১২টি জেনারেটর কিনতে তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা, ২০ এইচপি ১২টি বৈদ্যুতিক পাম্প ৫৪ লাখ টাকা, ১০ এইচপি ২৪টি বৈদ্যুতিক পাম্প ৯৬ লাখ টাকা, সোলার সিস্টেম ২১৬টি পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা, ১৮টি ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম ১৫ কোটি টাকা, ১৮টি ইন্টারকম সিস্টেম ৯০ লাখ টাকা, ৯টি বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা ৯০ লাখ টাকা, ১৮টি সিসি ক্যামেরা সিস্টেম তিন কোটি টাকা। লোড স্যাংকশন, বৈদ্যুতিক সংযোগ (ডেসকো), ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত বৈদুতিক বিল, ইলেক্ট্রিক ড্রয়িং ইত্যাদি খাতে দুই কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

খরচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ : প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রতি বর্গমিটার ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৪৪৫.৬১ টাকা। অথচ ঢাকার মিরপুরেই সমজাতীয় প্রকল্প মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে ১৫টি ১৪ তলাবিশিষ্ট আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি বর্গমিটারে ৩৭ হাজার ৯.৩১ টাকা এবং ঢাকার লালমাটিয়া হাউজিংয়ে কর্মচারীদের কাছে বিক্রয়ের জন্য ৫৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে ৪৩ হাজার ৬৬.৫৯ টাকা ধরা হয়েছে। প্রকল্পে বিদ্যুৎ স্টেশন নির্মাণে ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৩৩ টাকা ধরা হয়েছে। সমজাতীয় ঢাকার মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের প্রকল্পে ৭৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং লালমাটিয়া হাউজিং এস্টেটের নির্মাণ প্রকল্পে ৪৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ ধরা হয়।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলীরা বলছেন, প্রস্তাবিত খসড়া প্রাক্কলনে বর্ণিত কাজের আইটেমগুলোর দর গণপূর্ত অধিদফতরের দর তফসিল-২০২২ (সংশোধিত) অনুযায়ী ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ১৬ জুন এই প্রকল্পের প্রস্তাবনার ওপর মূল্যায়ন কমিটির মিটিং আছে। সেখানে প্রকল্পটি নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। যদি প্রকল্পের সার্বিক হিসাব ও কার্যক্রম ঠিক থাকে তাহলে সেটি একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করবে পিইসি সভা।