এমএসএমই দিবস ২০২৬

বাংলাদেশে এসএমই খাত অনেক সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জও কম নয়

Printed Edition
3rd-1
বাংলাদেশে এসএমই খাত অনেক সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জও কম নয়

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে বিবেচনা করা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এই খাতের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের বেশির ভাগ এবং মোট জিডিপির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসে এই এসএমই খাত থেকে। তবে বিশাল এই সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের এসএমই খাতকে নানাবিধ জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অপার সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক অবদান

বাংলাদেশে এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা। দেশের মোট শিল্প কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপ-শহর এলাকায় বেকারত্ব দূরীকরণে এটি প্রধান ভূমিকা রাখছে।

নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ : বুটিক, হস্তশিল্প, ই-কমার্স ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এটি সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে।

স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার : হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে আমদানি বিকল্প পণ্য তৈরিতে অবদান রাখছে।

রফতানি বৈচিত্র্যকরণ : তৈরী পোশাক খাতের পাশাপাশি এখন জুতা, পাটজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের মতো এসএমই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে, যা দেশের রফতানি আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক।

পথ চলার প্রধান চ্যালেঞ্জ

বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, দেশের এসএমই খাত এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে পারেনি। উদ্যোক্তাদের প্রতিনিয়ত বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় :

১. অর্থায়নের তীব্র সঙ্কট : বাংলাদেশের এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যাংকিং ঋণ পাওয়ার জটিলতা। জামানতহীন বা সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চড়া সুদে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। ব্যাংকগুলো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে যতটা আগ্রহী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন।

২. নীতিমালার জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক আমেজ : একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্স নিবন্ধন ও বিভিন্ন পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘ সময় ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। নীতিমালার এই জটিলতা নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে।

৩. আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও অদক্ষতা : বেশির ভাগ ক্ষুদ্র শিল্পে এখনো সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী প্রযুক্তির অভাবে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং গুণগত মান আন্তর্জাতিক স্তরের হয় না। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকের অভাবও একটি বড় সমস্যা।

৪. বাজারজাতকরণ ও লজিস্টিকস সমস্যা : প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বড় বাজারে বা পাইকারদের কাছে পৌঁছাতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত ব্যবস্থার মতো অবকাঠামোগত সঙ্কট তো রয়েছেই।

উত্তরণের উপায় ও ভবিষ্যৎ পথনকশা

এসএমই খাতের টেকসই বিকাশের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রথমত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘সহজ শর্তে’ এবং ‘স্বল্প সুদে’ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট লাইন চালু করা দরকার। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াকে সহজ করতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং ট্যাক্স হলিডের মেয়াদ বাড়ানো উচিত।

এ ছাড়াও উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং পণ্য প্রদর্শনের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মেলার আয়োজন করা প্রয়োজন। ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারলে বিপণন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এসএমই খাতের উন্নয়ন অপরিহার্য। চ্যালেঞ্জগুলোকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারলে এই খাতটিই হয়ে উঠবে ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি।