সংস্কার ব্যর্থ হলে জাতি মেনে নেবে না : বিচারপতি মতিন
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কাক্সিক্ষত সংস্কার বাস্তবায়ন ব্যাহত করার যেকোনো চেষ্টা জাতি মেনে নেবে না বলে সতর্ক করেছেন বিচারপতি এম এ মতিন। তিনি বলেন, ‘যারা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাদের এ চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না।’
গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুজন আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার : সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জন-আকাক্সক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বিচারপতি মতিন বলেন, সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কোনো সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। পরে মাজদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলা-এ হাইকোর্ট বিভাগ একটি যুগান্তকারী রায় দেন, যা বিচার বিভাগের পৃথকীকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
তিনি জানান, ওই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলে আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা দেয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু এসব নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার বিচারপতি নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের লক্ষ্যে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করে।
বিচারপতি মতিন অভিযোগ করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত সরকার এ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোকে সংসদে আইন হিসেবে পাস না করায় সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। তার ভাষায়, ‘দীর্ঘ ৭২ বছরের জাতীয় অর্জনকে এভাবে বর্জন করায় গোটা জাতি হতবাক ও মর্মাহত।’
তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগ সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠান, এবং এ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত আইনগুলো সংসদে পাস করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনগণ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সরকারকে নির্বাচিত করেছে এ প্রত্যাশায় যে, তারা এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। বিচারপতি মতিন বলেন, মাজদার হোসেন মামলার নির্দেশনাসহ সুপ্রিম কোর্টের আদেশসমূহ বাস্তবায়ন করা নির্বাহী বিভাগের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এসব নির্দেশনা অমান্য করা হলে তা সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিচার বিভাগের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে সমর্থিত সংস্কারগুলো এখন এক ধরনের ‘অলিখিত সংবিধান’-এর অংশে পরিণত হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ যথেষ্ট না হওয়ায়ই গণভোটের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। ফলে এ সংস্কার বাস্তবায়ন এখন জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে।
বিচারপতি মতিন অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন জোটের এমপিরা নির্ধারিত দুই শপথের পরিবর্তে একটি শপথ নিয়েছেন আর সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কারকে পাশ কাটানো হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৩টি সংশোধনসহ পাস হলেও, ১৬টি উপস্থাপন না করায় বাতিল হয়েছে। বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশও এর মধ্যে পড়ে।
গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালনা করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছরেও কোনো সরকার মাজদার হোসেন মামলার পূর্ণ বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন করার কথা বললেও নাগরিকদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য বিদায়ী সদস্য বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক, তাই এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন এবং অন্যান্য আলোচকরাও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় এখনো বহাল রয়েছে। শুধু আপিল দায়ের করলেই সেই রায় স্থগিত হয় না-এটি আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি।
ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন মন্তব্য করেন, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এবং এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা ছিল। অধ্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল সরকারের।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ফাহিম মাশরুর বলেন, গণভোটে বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সংস্কার বাস্তবায়নে নাগরিক চাপ কম দেখা যাচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়া উদ্বেগজনক।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক শর্ত। সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা ব্যর্থ হলে তা শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটও সৃষ্টি করতে পারে- এমন আশঙ্কাই উঠে এসেছে আলোচনায়।