ছত্রিশের শেষ দশক ও মঞ্চ নাটকের মানদণ্ড
Printed Edition
সুমন রায়হান
ছত্রিশের শেষ দশক- সরদার আব্বাস উদ্দিন রচিত একটি নাটকের বই, যা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত। নাটকটি পড়তে গিয়ে মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত কবর নাটকের কথা মনে পড়ে। যদিও দু’টি নাটকের প্রেক্ষাপট আলাদা কবর রচিত হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে, আর ছত্রিশের শেষ দশকের পটভূমি চব্বিশে গণ-অভ্যুত্থান। তবুও নাটক দু’টির দৃশ্যায়ন ভাবনা প্রায় একই : তা হলো আন্দোলন, শহীদ এবং কবর।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে লিখতে গিয়ে নাট্যকার বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিপ্লবী নাটক কবর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলতেই পারি। তবে উভয় নাটকের উপজীব্য হচ্ছে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং সেই আত্মত্যাগের চেতনা।
জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের স্পিরিট নাটকটিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা আগস্টে এসে ভয়াবহতা অর্জন করে। ‘ছত্রিশে জুলাই’ অর্থাৎ ৫ আগস্ট আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ও স্বৈরাচারের শেষ দিন। আন্দোলনের শেষ দশ দিনের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, লাশ গুম এবং চারজন বিশিষ্ট শহীদের কথোপকথনের মাধ্যমে নাট্যকার একটি কাব্যিক প্রতিবাদ ও স্মৃতিচারণ গড়ে তুলেছেন। নাটকের নামকরণও তাই অত্যন্ত সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
নাট্যকার নিজেও একজন দক্ষ নাট্যকর্মী, মঞ্চ অভিনেতা। তারই স্বাক্ষর বহন করে প্রতিটি সংলাপ, দৃশ্য ও পরিণতিতে।
মঞ্চ নাটক লেখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম, কাঠামো ও কৌশল অনুসরণ করলে নাটকটি নাট্যরূপে উপস্থাপনযোগ্য ও প্রভাবশালী হয়।
-বাস্তবধর্মী ও কাল্পনিক চরিত্র।
- চরিত্র অনুযায়ী সংলাপ
- গণ-আন্দোলনের আবহ
- আবেগপ্রবণ দৃশ্য বিন্যাস
এই নাটকের ভাষা প্রাঞ্জল, নাটকীয় ও বাস্তবসম্মত। কবরস্থানের পাহারাদার মজিদ, হকার ও তৃতীয় লিঙ্গের কৃষ্ণা- তিনজনেই তিনটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। দর্শকের বিরক্তিকর পরিস্থিতি ও সংলাপের একঘেয়েমি দূর করতে হাস্যরসের জোগান দিতে আঞ্চলিক ভাষা চমৎকার ভূমিকা পালন করে। চারজন শহীদসহ অন্যান্য চরিত্রের সংলাপ চলিত রীতির, অনেকটা কাব্যিক। একজনের সংলাপ যেন দীর্ঘ ভাষণের মতো না হয়ে যায়- সে বিষয়ে নাট্যকার ছিলেন বেশ সচেতন। তাই তো তিনি কবি আল মাহমুদের বিখ্যাত কবিতাটি চারজন শহীদকে দিয়েই আবৃত্তি করিয়েছেন। এখানেও তার মুন্সিয়ানা শতভাগ।
-নাটকের ভাষা হতে পারে আঞ্চলিক, সাহিত্যিক বা বাস্তবঘন যা বিষয় ও চরিত্রের ওপর নির্ভর করে। নাট্যকার এখানে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।
এই বইটি শুধু একটি নাট্যগ্রন্থ নয়, বরং একটি সময়ের দলিল। যারা মঞ্চ নাটক ভালোবাসেন, ইতিহাসে আগ্রহী বা সমাজ-রাজনীতির নাট্যরূপ দেখতে চান, তাদের জন্য বইটি অবশ্যই মূল্যবান। বইটি প্রকাশ করেছে টইটই প্রকাশন। প্রচ্ছদ করেছেন আফসার নিজাম।