ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন আজ
আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ঢাকার গুরুত্বারোপ
Printed Edition
ঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের জোট বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলন আজ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ জোটভুক্ত সাতটি দেশের নেতারা ব্যাংককে পৌঁছেছেন। সম্মেলনের সাইডলাইনে বিমসটেক নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে বিমসটেক গঠিত। ১৯৯৭ সালে বিসমটেক গঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন করোনা মহামারীর মধ্যে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ব্যাংককে ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব নেবে।
এবারের শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘অগ্রগতি, সহিষ্ণুুতা ও মুক্ত বিমসটেক’। শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার বিমসটেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বুধবার পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সামুদ্রিক যোগাযোগ সহযোগিতাবিষয়ক একটি চুক্তি সই হয়েছে। এ ব্যাপারে দেয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য চুক্তিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন একটি অভিন্ন বিমসটেক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পারস্পরিক শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আঞ্চলিক বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যে যথাযথ অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে বাস্তবমুখী ও সহযোগিতাপূর্ণ ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গার বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার সাথে তাদের নিজ দেশে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তনের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেন।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের জন্য খসড়া আলোচ্যসূচি এবং ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করেন।
তরুণদের উদ্যোক্ত হওয়ার আহ্বান : বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল ব্যাংককে পৌঁছেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় সুবর্ণ ভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপরন সিন্দোপারি।
পরে স্থানীয় সময় বেলা ৩টায় প্রধান উপদেষ্টা ব্যাংককে বিমসটেক ইয়ং জেনারেশন ফোরামে বক্তব্য রাখেন। এতে তিনি তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
তিনি বলেন, বিশ্বে পরিবর্তন আনতে হলে নিজের গ্রাম থেকে পরিবর্তন শুরু করো।
এই প্রজন্মের তরুণদের পৃথিবীর যেকোনো সময়ের তুলনায় ‘সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী প্রজন্ম’ হিসেবে অভিহিত করে ড. ইউনূস তাদের শুরুতে ছোট পরিসরে ব্যবসা চালু করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, তুমি একবারে রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই ছোট পরিসরে শুরু করে পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। শুরুতে বড় পরিসরে ব্যবসা চালু করা ভুল পথ।
ড. ইউনূস সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তরুণদের সামাজিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাই কী-নোট স্পিকার ছিলেন।
মোদির সাথে বৈঠকের সম্ভাবনা : এবারের শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে ড. ইউনূসের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে জোরাল আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এই বৈঠকের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও ভারতের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে কিছু বলা হচ্ছে না।
শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি গতকাল ব্যাংকক পৌঁছেছেন। এ নিয়ে করা টুইটে থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা সফর নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তবে সেখানে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠকের কথা উল্লেখ করেননি।
টুইটে মোদি লিখেছেন, আগামী তিন দিন আমি থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা সফর করব। এ সময় থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা এবং বিমসটেকের সদস্য দেশগুলোর সাথে ভারতের সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেব। আজ থাইল্যান্ডে আমি দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার সাথে দেখা করব এবং ভারত-থাইল্যান্ড বন্ধুত্বের পূর্ণাঙ্গ পরিসর নিয়ে আলোচনা করব। আগামীকাল আমি বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেব এবং রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের সাথেও দেখা করব।
গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল, বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ৩ এপ্রিল থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিনাওয়াত্রার সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনার জন্য বৈঠক করবেন। থাইল্যান্ড সফরে ওটাই হবে মোদির একমাত্র দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ড থেকে মোদি শ্রীলঙ্কা সফরে যাবেন। এতে বলা হয়, বিমসটেক সম্মেলনে ড. ইউনূসের সাথে মোদির দেখা হচ্ছে। সৌজন্য বিনিময়ও হবে। অনানুষ্ঠানিকভাবে দুই নেতার মধ্যে কথা হলেও হতে পারে।
তবে গত বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ড. ইউনূসের বৈঠকের সম্ভাবনার কথা জানান। তিনি বলেন, বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে সরকারপ্রধানদের বৈঠক সুবিধাজনক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আশা করা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির সাথে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হবে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বৈঠক না হচ্ছে ততক্ষণ আমাদের আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু বলব না।
এবারের শীর্ষ সম্মেলনে বিমসটেক ঘোষণাপত্র ছাড়াও ব্যাংকক ভিশন-২০৩০ অনুমোদন করা হবে। এতে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ থাকবে। সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইমের সাথে অংশীদারত্ব নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হবে। এ ছাড়া বিমসটেক ম্যাকানিজমের রুলস অব প্রসিডিউর এবং বিমসটেকের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দিতে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত গ্রুপের প্রতিবেদন অনুমোদন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সাথে থাইল্যান্ডের দুই মন্ত্রীর সাক্ষাৎ
বাসস জানায়, থাইল্যান্ডের সামাজিক উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তামন্ত্রী বরাভুত সিল্পা-আর্চা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপর্ণ সিন্ধুপ্রাই গতকাল ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাংককের একটি হোটেলে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন।