বাংলাদেশবাদ প্রতিষ্ঠাবর্ষ হোক ২০২৬
Printed Edition
কাজল রশীদ শাহীন
ইতালি একত্রীকরণের পর দেশটির জাতিয়তাবাদী নেতা গ্যারিবল্ডি বলেছিলেন, ‘আমরা ইতালির একত্রীকরণ করেছি। এখন আমাদের করণীয় হলো, ইতালীয়ান হয়ে ওঠা।’ ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু আমরা বাংলাদেশী হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের কোনো নেতা বাংলাদেশী হয়ে ওঠার আহ্বানও জানাননি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যাবতীয় সঙ্কটের গোড়ায় গলদ রয়েছে তার বাংলাদেশী হয়ে না ওঠার মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার স্বতান্ত্রিক সত্তা বা পরিচয় নির্মাণ। প্রধান বাধা ছিল ভাষা। ব্রিটিশ ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পরই শুরু হয় স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ বা লড়াই। ব্রিটিশ হটিয়ে দিয়ে নিশ্চিত করা হয় ভৌগোলিক স্বাধীনতা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা পেতে হলে তো চাই অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক এবং ভাষার স্বাধীনতা। ভৌগোলিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন এই সকল প্রপঞ্চের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। যার জন্য সবার আগে প্রয়োজন ভাষার স্বাধীনতা বা দাসত্ব মুক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়টা উপলব্ধি করেছিল যথার্থভাবে। এ কারণে তারা সিদ্ধান্ত নেয় ইংলিশ ভাষাভাষী হলেও তাদের ইংরেজি হবে ব্রিটিশদের থেকে আলাদা। সাহিত্য হবে স্বতন্ত্র। যা প্রতিনিধিত্ব করবে যুক্তরাষ্ট্রকে। ওদের কাছে তাই ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভাষার স্বাধীনতা। যা তাদেরকে স্বতন্ত্র করে তোলে অন্যদের থেকে, তাবৎ বিশ^মাঝেও। এ কারণে আমরা বিস্তর পার্থক্য দেখি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ইংলিশের মধ্যে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এই পার্থক্য, ভাষার রাজনীতির সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্রবাদী আন্দোলনকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত লক্ষ্যে ও পরিণতির দিকে।
পরাধীন দেশের জন্য জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রপঞ্চ। স্বাধীন দেশের জন্য হলো স্বতন্ত্রবাদ। জাতীয়তাবাদ হলো সংঘবদ্ধতার নিয়ামক বিশেষ। স্বতন্ত্রবাদ হলো আত্মপরিচয় ও আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে ওঠার বীজমন্ত্র। স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা ও চর্চা করা সম্ভব না হলে কোনো দেশের পক্ষেই আত্মসত্তার রাজনীতি বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়, দুরূহ। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে স্বতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত করার কোনো চারিত্র্যলক্ষণ দেখা যায়নি। আমরা উপলব্ধি করিনি স্বাতন্ত্র্য নির্মাণ বা স্বতন্ত্রবাদ চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে স্বতন্ত্রবাদকে ধারণ ও আত্মস্থ না করার ব্যর্থতা।
পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম, জগত-সংসারের চিরন্তন বাস্তবতা। আজ যা নতুন, কাল তা পুরনো। দিন-মাস-বছরও এভাবে যায় আর আসে। বছরের ব্যাপ্তি বা সময় পরিধি একটু বেশি হওয়ায় তা দৃষ্টি কাড়ে। সঙ্গত কারণে হয়ে ওঠে পৃথক গুরুত্বের দাবিদার। এর মধ্যে আবার কোনো কোনো বছর বিশেষভাবে দাগ কেটে যায় জাতীয় জীবনে। তখন সে কেবল একটা সংখ্যা থাকে না। আত্মীকরণ ঘটে, দেশ ও জাতির অনিবার্য এক অংশ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকগুলো বছরের সংঘবদ্ধ এক-একটা সংখ্যা না হয়ে, হাজির হয় পৃথক এক সত্তা ও স্বতন্ত্র মহিমায়। স্মরিত ও বরিত হয় জাতীয় জীবনের সারথি জ্ঞানে। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ তেমন বছরের প্রতিভূ রূপে জারি রয়েছে আমাদের মাঝে। এসব বছর আমাদের জাতীয় জীবনের নানাকিছুর নির্ধারক শক্তি। দিশা জাগানিয়া মাইলফলক বিশেষ। যার আগে ও পরের মধ্যে রয়েছে প্রভূত পার্থক্য ও ইতিহাসের বিচিত্র সব সমীকরণ। আমরা আশা করি, ২০২৬ সেই রকম একটা নীতিনির্ধারক বছর হয়ে উঠুক আমাদের জাতীয় জীবনে।
যে ব্যতিক্রম ও নির্ধারক বছরের কথা আমরা বললাম ঠিক সেইরকম নয়। নতুন বছর হোক দেশ ও জাতির নতুন কিছু নির্মাণ ও অর্জনের সারথি। যা আমাদের উল্লেখিত বছরসমূহকে আরো অর্থবহ ও তাৎপর্যময় করে তুলবে। দেশবাসী প্রকৃতার্থেই স্বাধীনতার সুফল পাবে। বাস্তবায়িত হবে গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষাসমূহ। কিছু জিনিস অর্জন করতে হয় আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। কিছু জিনিস পেতে হয়-ধরা দেয়-প্রতিষ্ঠা পায় নিরন্তর এক সাধনায়- লক্ষ্যভেদী চর্চায়। একটা দেশের স্বাধীনতা মেলে আন্দোলন-সংগ্রামের দৌলতে। গণ-অভ্যুত্থানও সংঘটিত হয় একই প্রক্রিয়ায়। কিন্তু স্বাধীনতাকে সদর্থক অর্থে বাস্তবায়ন করতে হলে, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল সকলের কাছে পৌঁছাতে সাধনা লাগে। প্রয়োজন হয় অপরের কল্যাণ সাধনের। পরহিত ব্রতে সম্মিলিত চর্চা আর নিরন্তর অনুশীলনের। গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্যসমূহ পূরণ ও বাস্তবায়নেও একই কথা প্রযোজ্য।
গণ-অভ্যুত্থানের গঠনের মধ্যে যুক্ত থাকে দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর তার লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন সম্মিলিত সাধনা। আমাদের এখন সাধনা করার সময় এসেছে। সেই সাধনা হবে গণতন্ত্রের, সুশাসনের, সামাজিক সাম্যের, ন্যায়বিচারের, বাক্ স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের মুক্তির জন্য। এসবের সবটাই পূরণ হবে যদি আমরা গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা ও নৈতিকতাসমূহ সর্বস্তরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। গণতন্ত্র আন্দোলন করে কিংবা গণ- অভ্যুত্থান দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সাধনা, অনুশীলন আর চর্চা। ২০২৬ হোক গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরুর প্রত্যয়দীপ্ত এক বছর।
নতুন এই বছরের কিছু বিশেষ দিক রয়েছে বলে মনে হয়। এই বিশেষ দিককে আমরা যদি বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি তা হলেই ২০২৬ আমাদের জন্য হয়ে উঠতে পারে আক্ষরিক অর্থেই এক অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ এক সংখ্যা। এর জন্য প্রয়োজন নতুন সাহিত্য।
দেশ ও জাতির ভাগ্যাকাশের বাঁক বদলের এখুনি সময়। সেই সময়কে কাজে লাগানো তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা সৃষ্টি করতে পারব নতুন সাহিত্য। যে সাহিত্য এই জাতিকে-দেশবাসীকে দেবে নতুন এক দিশা। জাতীয় জীবনের লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়ন হবে। প্রশ্ন হলো কী সেই লক্ষ্য? আমরা মনে করি, সেই লক্ষ্য হলো ‘বাংলাদেশবাদ’ প্রতিষ্ঠা করা। প্রভূত সব অর্জনের পরও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রধানতম কারণ হলো। এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু ‘বাংলাদেশবাদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমরা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছি ঠিকই। কিন্তু সকলে মনে প্রাণে বাংলাদেশী হয়ে উঠতে পারিনি। ভাষার রাজনীতিতে দাসত্বের মুক্তি ঘটেনি এখনই। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দিকে এখনো দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হয়নি। এর কারণ সম্ভবত ‘বাংলাদেশবাদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রায় সর্বস্তরে ‘ইনক্লুসিভ’ বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কিভাবে কোন পথে সেটা নির্মিত হবে তার আলাপ নেই। গণ-অভুত্থানের দিনগুলোতে কিংবা তার পরও উচ্চারিত হয়েছে কিছু সেøাগান। দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ হয়েছে সেসব- এক. ‘‘দিল্লি না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। দুই. ‘‘পিন্ডি না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। তিন. ‘‘নিউইয়র্ক না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। চার. ‘‘ওয়াশিংটন না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। পাঁচ. ‘‘মক্কা না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। ছয়. ‘‘বেইজিং না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। সাত. ‘‘মস্কো না ঢাকা’, ঢাকা ঢাকা’’। এর মধ্যে প্রথম দিকের কয়েকটি সেøাগান বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছে। তবে, সবগুলোই কমবেশি আলোচনায় এসেছে। ঘুরেফিরে উচ্চারিত হয়েছে আড্ডায়-আলাপে।
এই অবস্থায়, সবার আগে বাংলাদেশের কিবলা ঠিক করা কি জরুরি নয়? একটা দেশের যদি এতগুলো কিবলা হয় এবং নিজেদের কিবলা যদি অন্যত্র থাকে-অন্যের হয়- তা হলে তার স্বতন্ত্রতা বলে আদৌ কিছু থাকে কি, নিশ্চয় নয়? কিবলা অন্যত্র থাকার অর্থই হলো তাদের কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন তারা গিলে খেতে চাইবে আমাদের। বন্ধুর মোড়কের আড়ালে জারি রাখবে হাঙ্গরের রূপ। অতীত অভিজ্ঞতা এ রকমই বলে। পিন্ডি, দিল্লির ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছে। তা হলে কী হবে বাংলাদেশের, কিবলা কি লাগবেই? কিবলা না থাকলে কি চলে না? আচ্ছা আমরা-নিজেরাই কি আমাদের কিবলা হয়ে উঠতে পারি না? অবশ্য, কিবলার কথায়, ওইসব সেøাগানে-দেয়াল লিখনে বলা হয়েছে ঢাকাকে কিবলা করতে হবে। কিন্তু কেমনে হবে, কিভাবে হবে- এসব ব্যাপারে কোনো তরফে কিছুই বলা হয়নি। সেøাগানেই সীমাবদ্ধ আছে কেবল। কোনো রূপরেখাও দেয়া হয়নি।
মুসলমান হিসেবে আমাদের কিবলা যেমন পশ্চিমে, কাবাঘরের প্রতি। একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের দিক হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ’। ‘ইজম’ বা ‘বাদ’-এর নাম হওয়া প্রয়োজন ‘বাংলাদেশবাদ’। এখানে যে বা যারা যে আদর্শে বিশ^াসী বা অনুসরণকারী হোক না কেন, ব্যক্তি বা দল হিসেবে তার অভিপ্রায় যাই-ই থাকুক না কেন, চূড়ান্তভাবে তার লক্ষ্য ও আদর্শ হবে ‘বাংলাদেশবাদ’ বাস্তবায়ন; আর কিবলা হবে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। প্রশ্ন হলো, কী থাকবে সেই ‘বাংলাদেশবাদ’-এ? ‘বাংলাদেশবাদ’-এর ভিত্তিই বা কী হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর অতি সংক্ষেপে এখানে দেয়া হলো।
এই ভূখণ্ডের এবং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক আলাপে বিভিন্ন ‘ইজম’ বা ‘বাদ’ এর কথা শোনা যায়। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই ধারা বহুল চর্চিত। বিভিন্ন দল বা ব্যক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে ওই ‘বাদ’ প্রতিষ্ঠিত করা। এগুলো যে তারা ঠারে ঠারে বা অপ্রকাশ্যে বলে বিষয়টা এমন নয় মোটেই। এসবের মধ্যে বহুলভাবে উচ্চারিত হয়েছে ‘মার্কসবাদ’, ‘লেনিনবাদ’, ‘মাওবাদ’ ইত্যাদি।
এতো গেল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ‘বাদে’র ধারণা। এ ছাড়াও রয়েছে ‘মানবতাবাদ’, ‘সাম্যবাদ’, ‘সমাজবাদ’ প্রভৃতির সামষ্টিক প্রতিনিধিত্বকারী ‘বাদ’ প্রতিষ্ঠার লড়াই ও সংগ্রাম। রাজনৈতিক দলগুলো এ রকম কোনো না কোনো ‘বাদ’ দ্বারা আচ্ছন্ন বা নিমগ্ন। এমনকি পেশাজীবী শ্রেণী বা সমাজের ‘বাদ’ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, প্রকাশ্যেই। বুদ্ধিজীবীরাও- সবাই না হলেও একটা বড় অংশ ‘বাদ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ও য্ক্তু রয়েছে সক্রিয়ভাবেই। ‘পৃথিবী’ নামক গ্রহ যেমন ‘সূর্য’কে কেন্দ্র করে ঘোরে অবিরাম। উনারাও ঠিক তাই ‘বাদ’ প্রদক্ষিণকেই লক্ষ্য ও স্বপ্ন জ্ঞান করেছে কেবল।
উনাদের এই স্বপ্নের কাছে দেশ এবং জনগণও গৌণ হয়ে যায়। একদা রাজপথ কাঁপিয়ে জোর গলায় প্রকাশ্যে-সমবেত হয়ে সেøাগান দেয়া হয় ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ বলা হয়, ‘আমার নেতা, তোমার নেতা, মাও সেতুং মাও সেতুং’। বীরদর্পে ঘোষিত হয়, ‘চীনের চেয়ারম্যান, আমার চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান’। ঝাঁকের কৈ-এর মতো এদেশের তারুণ্যের একটা বড় অংশ, লেখক-কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-সম্পাদক-আইনজীবী-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা আমদানি করা ‘বাদ’ বা ‘ইজম’ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নেই বিভোর থেকেছেন। নিজেদের জীবন-যৌবনের প্রায় পুরোটাই উৎসর্গ করেছেন। কারও মনেই এই প্রশ্ন উদিত হয়নি, অন্যের ‘বাদ’ বা ‘আদর্শ’ কি একটা দেশের মুক্তি দিতে পারে? অন্যের কোনো আইডিয়া বা ধারণা- তা সে যতই মহোত্তম হোক না কেন? তার ফটোকপিকরণ করার মধ্যে দিয়ে আদতে কি নিজেদের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়? প্রয়োজন হলো অন্যের যা কিছু ভালো, যা কিছু নেয়ার মতো, অনিবার্যভাবে যা কিছু আমাদের উন্নয়ন ও কল্যাণের পক্ষে সহায়ক- সেসব গ্রহণ করে নিজেদের-নিজস্ব ‘বাদ’ বা ‘ইজম’ প্রতিষ্ঠা করা; যা হবে একান্তই বাংলাদেশ, বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি জাতির জন্য আদর্শিক ও ইহজাগতিক উন্নয়ন ও কল্যাণের তরে নিবেদিত ও উৎসর্গিকৃত।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যারা সরাসরি কোনো ‘বাদ’-এর কথা বলে না। কিংবা এ রকম কিছু দৃশ্যমান করে না, তারাও মূলত দলীয় ‘বাদ’ বা দলের প্রতিষ্ঠাতাকারীর ‘বাদ’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই বলে যে, তারা দেশের জন্য রাজনীতি করে। দেশ ও জনগণের মঙ্গলাকাক্সক্ষায় জীবন বিসর্জন দিতে সদা প্রস্তুত। দেশ ও জনগণের কল্যাণই তাদের একমাত্র স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রত্যাশা।
এখন পরিষ্কার হওয়া দরকার ‘বাংলাদেশবাদ’ কী? কী কী থাকবে সেখানে। এ জাতির-এ দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ যারা ইতিহাসের বাঁকবদলের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, এদেশের মানুষের ভাষা, রাজনীতি, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভেবেছেন- কালজয়ী চিন্তা হাজির করছেন। বিশ^জয়ের স্বপ্ন দেখেছেন। জনগণের মুক্তি ও কল্যাণে নিজস্ব চিন্তার জোগান দিয়েছেন- উনাদের সকলের দেশভাবনা, রাষ্ট্রচিন্তা ও জনমুক্তির আকাক্সক্ষাকে একত্রিত করেই বিনির্মাণ করতে হবে ‘বাংলাদেশবাদ’। কেবল কোনো ব্যক্তি বা দলের আদর্শ নয়, এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আদর্শ, লক্ষ্য ও স্বপ্নকে ধারণ করেই বিনির্মাণ করতে হবে ‘বাংলাদেশবাদ’কে। এটা সম্ভব হলেই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বা ‘ইনক্লুসিভ’ বাংলাদশের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠিত হবে। ‘বাংলাদেশবাদ’ হলো এ জাতির কীর্তিমান ব্যক্তিদের-রাজনীতির স্মরণীয় ও বরণীয় মানুষদের ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষার সম্মিলন।
২০২৬ হোক এই সম্মিলন বাস্তবায়নের বছর। আমরা যে মত ও পথেরই হয় না কেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে সকলেই যেন ‘বাংলাদেশবাদ’-এ আজ্ঞাবহ হই, এই হোক আমাদের ২০২৬ এর অঙ্গীকার। জ্ঞানকাণ্ডের সকল শাখা-প্রশাখায় চর্চিত হোক ‘বাংলাদেশবাদ’ এর সারাৎসার ও অবিকল্প প্রয়োজনীয়তা। যার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে, গণ-অভ্যুত্থান তাৎপর্যতা পাবে, গণতন্ত্র ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ ঘটবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শুভবোধসমূহ রয়েছে তার ‘বাংলাদেশবাদ’ এর অভ্যন্তরে। এ কারণে এই প্রপঞ্চের মাঝেই খুঁজে নিতে হবে আমাদের মুক্তি, স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার বারতাসমূহ।