জাতীয় পাখি এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে

Printed Edition

শরিফুজ্জামান লোহাগড়া (নড়াইল)

ভোরবেলা বাড়ির আঙিনায়, বাগানে কিংবা গাছের ডালে চঞ্চল ভঙ্গিতে উড়ে বেড়ানো যে পাখিটির মিষ্টি শিস একসময় গ্রামীণ জনপদের ঘুম ভাঙাত, তার নাম দোয়েল। আমাদের জাতীয় পাখি। শহরের যান্ত্রিকতা কিংবা গ্রামের চিরচেনা রূপ; সবখানেই অতি পরিচিত ছিল এই পাখিটি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃতির এই চেনা অতিথি এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সঙ্কট, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে দোয়েলের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দোয়েলের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ প্রাকৃতিক আবাসস্থলের চরম সঙ্কট। একসময় গ্রামাঞ্চলে বিস্তীর্ণ গাছপালা, ঝোপঝাড় ও সবুজ পরিবেশ থাকলেও দ্রুত নগরায়ন, বনভূমি উজাড় এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে দোয়েল।

আবাসস্থলের পাশাপাশি তীব্র খাদ্য সঙ্কটও এই পাখির টিকে থাকার লড়াইকে কঠিন করে তুলেছে। দোয়েল মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক পোকামাকড়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এতে একদিকে যেমন তাদের খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে রাসায়নিকের বিষাক্ত প্রভাব পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ও প্রজনন ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আমাদা কলেজের প্রভাষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রূপক মুখার্জি বলেন, একসময় আমাদের এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দোয়েল দেখা যেত। এখন আগের মতো আর চোখেই পড়ে না। গাছপালা ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় পাখিগুলো তাদের প্রাকৃতিক আশ্রয় হারাচ্ছে। একই সুর লোহাগড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম হায়াতুজ্জামানের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার এবং নির্বিচারে গাছ কাটার কারণেই দোয়েলের সংখ্যা কমছে। জাতীয় পাখি সংরক্ষণে এখনই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জোড়া ধাক্কায় দোয়েলের জীবন আজ সঙ্কটাপন্ন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই পাখির বাসা নষ্ট হচ্ছে, মারা যাচ্ছে ডিম ও ছানা। নড়াইল জেলা বন বিভাগের কর্মী হাসান খান বলেন, গাছপালা কমে যাওয়া এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের কারণে এ পাখির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। দোয়েলসহ সব বন্যপ্রাণী রক্ষায় আমাদের বেশি বেশি দেশীয় গাছ লাগাতে হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে জোর দিতে হবে।