চুয়াডাঙ্গায় পাট জাগে পানির সঙ্কট, বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়
Printed Edition
এফ এ আলমগীর চুয়াডাঙ্গা থেকে
ভুট্টার আবাদে ব্যাপক বিস্তার লাভ করার পর চুয়াডাঙ্গায় সোনালি আঁশ পাটের আবাদ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। তবে চলতি মৌসুমে সেই পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা বদলে গেছে। কয়েক বছরের তুলনায় এবার এ জেলায় পাটের আবাদ বেড়েছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও অতিক্রম করেছে। কৃষি বিভাগ ও কৃষকেরা এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পোকার আক্রমণ এবং পাট জাগ দেয়ার পানির সঙ্কট তাদের ভাবিয়ে তুলছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় আট হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে নয় হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত মৌসুমেও জেলার আবাদি জমির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৯৯৫ হেক্টর।
চার উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হয়েছে দামুড়হুদায়। সেখানে চার হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে চার হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে। আলমডাঙ্গায় দুই হাজার ৫৭২ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাষ হয়েছে দুই হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে। জীবননগরে এক হাজার ৫৮৮ হেক্টরের বিপরীতে আবাদ হয়েছে এক হাজার ৬২০ হেক্টর এবং সদর উপজেলায় ৪২০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাট চাষ হয়েছে ৫১২ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত এক দশকে চুয়াডাঙ্গায় পাটের আবাদ ও উৎপাদনে নানা উত্থান-পতন দেখা গেছে। তুলনামূলক কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কৃষক পাটের পরিবর্তে ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষে ঝুঁকছেন। ফলে জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে ভুট্টার অবস্থান শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। তবে গত মৌসুমে পাটের বাজারমূল্য ভালো থাকায় এবং এবার লাভজনক দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় কৃষকেরা পাটের আবাদ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ, সার, কীটনাশক, নিড়ানি, কাটা ও জাগ দেয়াসহ বিভিন্ন খাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১২ মণ পাট উৎপন্ন হয়। গত মৌসুমে কৃষকেরা প্রতি মণ পাট চার হাজার ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তবে চলতি মৌসুমে অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণের কারণে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে গেছে। এটা উৎপাদন ব্যয়ের উপর কিছুটা প্রভাব ফেলবে।
চুয়াডাঙ্গার পাটচাষিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে জাগ দেয়ার পানির সঙ্কট। বর্ষার শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জেলার খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রয়োজনীয় পানি থাকে না। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে জলাধারের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে অনেক কৃষককে নদী বা দূরের পুকুরে সেচের মাধ্যমে পানি এনে পাট জাগ দিতে বা পচাতে হচ্ছে। কেউ কেউ ‘রিবন রেটিং’ বা আঁশ ছাড়িয়ে পাট প্রক্রিয়াজাত করছেন। এতে অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ ব্যয় হওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেলে চুয়াডাঙ্গায় পাট চাষের এই ইতিবাচক ধারা আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, চুয়াডাঙ্গা ভৌগোলিক কারণে পাট চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী এলাকা নয়। কারণ, এখানে পাট পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় জলাধারের ঘাটতি রয়েছে। তবে জেলায় ব্যাপক পানচাষ হওয়ায় পাটের চাহিদা রয়েছে। সেই সাথে কৃষকদের আগ্রহও বেড়েছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় চলতি মৌসুমে জেলায় পাটের উৎপাদন ভালো হওয়ার আশা করা হচ্ছে।