বৈশাখী মেলা ঘিরে চন্দনাইশে হাতপাখা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা
Printed Edition
এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা ও লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য জব্বারের বলী খেলাকে ঘিরে চন্দনাইশে কুটিরশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। বিশেষ করে তালপাতার হাতপাখা তৈরিতে দিনরাত কাজ করছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের শত শত পরিবার।
আগামী ২৫ এপ্রিল নগরীর লালদীঘি এলাকায় বসবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। একই সাথে অনুষ্ঠিত হবে বহুল জনপ্রিয় জব্বারের বলী খেলা (কুস্তি প্রতিযোগিতা)। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের মতো এবারো চন্দনাইশ উপজেলার পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জিহস ফকির পাড়া হয়ে উঠেছে হাতপাখা তৈরির এক বিশাল কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রস্থল।
সরেজমিন দেখা যায়, জিহস ফকির পাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই এখন হাতপাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ- পরিবারের সবাই দলবদ্ধভাবে কাজ করছেন তালপাখা তৈরিতে। কেউ তালপাতা কাটছেন, কেউ বাঁশ ও বেতের কাঠামো তৈরি করছেন, আবার কেউ নিপুণ হাতে নকশা আঁকছেন। পুরো এলাকাজুড়ে চলছে এক উৎসবমুখর কর্মচাঞ্চল্য।
স্থানীয় কুটিরশিল্পীরা জানান, এক জোড়া হাতপাখা তৈরি করতে বর্তমানে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ছে। পাইকারি বাজারে এগুলো বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়। নকশা ও মানভেদে কিছু পাখার দাম ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্তও ওঠে।
শিল্পীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু জিহস ফকির পাড়াতেই প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবার এই কাজে জড়িত। পুরো চন্দনাইশ উপজেলায় প্রায় পাঁচ শ’র বেশি পরিবার জীবিকার উৎস হিসেবে হাতপাখা তৈরির ওপর নির্ভরশীল।
প্রতি বছর বৈশাখ এলেই লালদীঘির মেলায় এই হাতপাখার বিশেষ চাহিদা তৈরি হয়। মেলার অন্যতম আকর্ষণ জব্বারের বলী খেলার পাশাপাশি রঙ-বেরঙের তালপাতার হাতপাখা ক্রেতাদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মেলাকে কেন্দ্র করে শিল্পীরা আগেভাগেই উৎপাদন বাড়িয়ে দেন।
স্থানীয়রা জানায়, এ বছর বৈশাখের শুরু থেকেই তাপদাহ বিরাজ করছে। ফলে মেলার বাইরেও হাতপাখার চাহিদা বাড়বে বলে আশা করছেন তারা। এ কারণে মেলা শেষ হলেও উৎপাদন কার্যক্রম চলমান থাকবে তাদের। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কুটিরশিল্পীরা। তারা জানান, বাঁশ বেত ও তালপাতার দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এতে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
জিহস ফকির পাড়ার একাধিক শিল্পী বলেন, ‘আমরা বংশপরম্পরায় এই পেশার সাথে জড়িত। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়ায় এখন আর আগের মতো লাভ হয় না। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছি।’ স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকায় অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার হাতপাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু তারা এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও তারা উপেক্ষিত ছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। কিন্তু অন্যান্য পেশার মানুষের উন্নতি হলেও আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। কুটিরশিল্পীদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’
কুটিরশিল্পীদের দাবি, যথাযথ সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প শুধু টিকে থাকবেই না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।