মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু : গল্পের বিচারে নাটক নাকি হরর মুভি?

সাকিবুল হাসান
Printed Edition
bino-1
মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু : গল্পের বিচারে নাটক নাকি হরর মুভি?

ইউটিউবে ৩০ মিলিয়ন ভিউয়ের বিশাল মাইলফলক অর্জন করলেও ‘মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু’ নাটকটি এখন দর্শকদের কাছে যুক্তি আর সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখক রাদাইন শাহ এবং পরিচালক মুসাদ্দিক মালেক এমন এক অদ্ভুত জগত তৈরি করেছেন যাকে অনায়াসেই ‘কামিয়ারভার্স’ বলা যায়। এই মহাবিশ্বের একমাত্র সূর্য হলো কামিয়ার (বিলাল আব্বাস খান) একজন মাদকাসক্ত, উচ্ছৃঙ্খল এবং বিত্তবান যুবক, যার চারপাশেই ঘোরে নাটকের প্রতিটি নারী ও পুরুষের জীবন। নাটকের চিত্রনাট্য এতটাই দুর্বল যে, এটি ‘বেচডেল টেস্টে’ শোচনীয়ভাবে ফেল করেছে; এখানে দুজন নারী যখনই কথা বলেন, তাদের আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু থাকে কামিয়ার। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কামিয়ারকে মানুষ নয়; বরং এক অশুভ আত্মার মতো উপস্থাপন করা হয়েছে, যাকে ভয় দেখিয়ে শিশুদের ঘুমানোর কথা বলা হয়। নাটকের সবচেয়ে অদ্ভুত চরিত্র হলো হানি তাহা অভিনীত সেই নামহীন মেয়েটি, যাকে সবাই স্রেফ ‘ওহ লড়কি’ বা ‘পেশেন্ট’ হিসেবে চেনে। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কেবল কামিয়ারের সান্নিধ্য পাওয়ার লোভে সে তাকে ড্রাগ খাওয়ানো এবং একটি আপত্তিকর ভিডিও তৈরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পাঁচটি এপিসোড ধরে এই মেয়ের কোনো নাম প্রকাশ না করাটা যেমন হাস্যকর, তেমনি রহস্যজনক হলো তার প্রতি কামিয়ারের পরবর্তী আচরণ। তাকে দুবাইয়ের টিকিট এবং নতুন পরিচয় দিয়ে কামিয়ার যেভাবে পুরস্কৃত করে, তা কোনো সুস্থ গল্পের কাঠামোয় পড়ে না। থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন অভিনেত্রী কেন এমন একটি যুক্তিহীন চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হলেন, তা দর্শকদের কাছে বড় একটি প্রশ্ন।

গল্পের তথাকথিত ভ্যাম্প ফারিহার চরিত্রটি নাটকটিকে পুরোপুরি ‘হরর’ ঘরানায় নিয়ে গেছে। তার দামি আসবাবে ঠাসা ঘরে একটি রহস্যময় লাল ক্রিস্টাল বল দেখা যায়, যা তথাকথিত ‘রেড ম্যাজিক’ বা ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। কামিয়ার যখন তাকে বিষ খাইয়ে ড্রয়িং রুমে আটকে রেখেছিল এবং সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, দর্শকরা ধরে নিয়েছিল তার মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই পরের এপিসোডেই ভোর ৪টায় তাকে কামিয়ারের হাসপাতালের বেডের পাশে দেখা যায়। এই অলৌকিক পুনরুত্থান দেখে মনে হতেই পারে যে ফারিহা কোনো সাধারণ মানুষ নয়; অন্যদিকে নায়িকা আয়রা, যে একজন হবু ডাক্তার, তার আচরণ সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। সে কামিয়ারের সাইবার ট্রাক ভাঙচুর করে, তাকে জনসম্মুখে লাঠি দিয়ে পেটায় এবং কয়েক দফায় চড় মারে। অথচ কামিয়ার যখন তাকে বিরক্ত করা বন্ধ করে দেয়, তখনই সে অদ্ভুতভাবে তার প্রেমে পড়ে যায়। তার এই মানসিক দ্বান্দ্বিকতা বা ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ কোনো সাধারণ চিকিৎসার আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো- তার বাবা নিজেও একজন ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও মেয়ের এই অদ্ভুত আচরণের কোনো চিকিৎসা বা প্রতিকার করতে পারেন না, কারণ তাকে পুরো নাটকে একবারও ডাক্তারি করতে দেখা যায় না। নাটকের এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে একমাত্র স্বস্তির জায়গা হলো আসিম আজহারের গাওয়া গান এবং কামিয়ারের সহকারীর সেই সাহসী জবাব। সাড়ে তিন লাখ টাকার বিল পড়তে না পারায় কামিয়ার যখন তাকে অপমান করে, তখন তার পাল্টা জবাব ‘পড়ালেখা জানলে কি আর তোমার চাকর হতাম?’ দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। সব মিলিয়ে সাইবার ট্রাকের অহেতুক আস্ফালন, চড় খেয়ে প্রেমে পড়া এবং বিষ খেয়েও বেঁচে ফেরার এই গল্পটি রোমান্টিক ড্রামার নামে আসলে একটি হরর সার্কাস ছাড়া আর কিছুই নয়।