৩০ বছরেও বদলায়নি পদ্মার চরের ভাগ্য
বিদ্যুৎ শিক্ষা চিকিৎসাবঞ্চিত শিবচরের হাজারো পরিবার
Printed Edition
আহসান হাবীব শিবচর (মাদারীপুর)
১৯৯৬ সালে পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রায় তিন দশক ধরে বসবাস করছে হাজার হাজার পরিবার। সময়ের প্রবাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এই চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের হাজী লেদু চৌকিদার কান্দি, চর জানাজাত ইউনিয়নের সামাদ খার কান্দি এবং মাদবরেরচর ইউনিয়নের মোল্লা কান্দি এলাকায় প্রায় এক হাজার পরিবার দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বসবাস করছে। একসময় এসব মানুষের নিজস্ব ভিটেমাটি ও আবাদি জমি থাকলেও পদ্মার ভয়াল ভাঙনে সব হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। বর্তমানে সরকারি জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
চরাঞ্চলে আধুনিক নাগরিক সুবিধার চরম অভাব স্পষ্ট। প্রতিটি বাড়িতে ছোট আকারের সৌর প্যানেল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ না থাকায় শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌকা। চরের ভেতরে নেই কোনো পাকা সড়ক। ফসলি জমির সরু বাঁকা পথই তাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা।
জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি ও মৎস্য আহরণ হলেও প্রাকৃতিক ঝুঁকি ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে চরাঞ্চলে রয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়ে আছে চরাঞ্চলের শিশু-কিশোররা। চরে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত। ফলে শিক্ষাবঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছে নতুন এই প্রজন্ম।
স্থানীয় অভিভাবক ঈসমাঈল খান বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ নেই। এখানে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্তু কোনো হাইস্কুল নেই। নদী পেরিয়ে অন্যত্র স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমরা একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরো নাজুক। চরাঞ্চলে নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা চিকিৎসক। জরুরি চিকিৎসার জন্য রোগীদের উপজেলা সদরে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা।
চরাঞ্চলের এক ইউপি সদস্য বাদশা বেপারী বলেন, উন্নত চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী পথেই মারা যায়। প্রসূতি মায়েদের জন্য কোনো প্রশিক্ষিত সেবাদাতা নেই। অনেক সময় নৌকায় বা পথে সন্তান প্রসব করতে হয়। আমরা বহুবার একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য আবেদন করেছি।
প্রশাসনিকভাবে চরাঞ্চলটি বিভিন্ন ইউনিয়নের মধ্যে বিভক্ত। কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ড এবং মাদবরেরচর ইউনিয়নের একটি অংশ ছাড়াও বৃহৎ অংশটি চর জানাজাত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। ফলে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে এখানে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চরাঞ্চলের জন্ম, বিকাশ ও মৃত্যু- সবকিছুই সময়ের সাথে পাল্টে যাচ্ছে। এক সময় ধূ-ধূ বালুচর থাকলেও ধীরে ধীরে সেখানে কাশবন গড়ে ওঠে, প্রাণিকুলের বসতি তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে মানুষের বসবাস শুরু হয়। সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের কয়েকজন সাংবাদিক নেতাও এই এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন, তাদের দুর্দশার চিত্র প্রত্যক্ষ করেন এবং এ বিষয়ে লেখালেখির আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, চরাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই হতদরিদ্র। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছি।
তবে বাস্তবতা হলো, তিন দশক পার হলেও উন্নয়নের মূলধারার বাইরেই রয়ে গেছে পদ্মার এই চরাঞ্চলের মানুষ। বিদ্যুৎ সংযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের দাবিতে এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা সরকারের কার্যকর উদ্যোগে হয়তো দ্রুতই বদলে যাবে তাদের জীবনের চিত্র।