যাদের ত্যাগে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ

পুলিশের হয়রানিতে বাসায় ঘুমাতে পারতেন না মামুন

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
back 5
পুলিশের হয়রানিতে বাসায় ঘুমাতে পারতেন না মামুন

শহীদ আল মামুনের শৈশব কেটেছে ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামীণ সবুজ শ্যামল পরিবেশে, যা তাকে প্রাকৃতিক ¯িœগ্ধতায় বিকশিত হতে সহায়তা করেছে। আর সেই মামুন শহরে এসে রাতে নিজের ঘরে নির্বিঘেœ ঘুমাতে পারতেন না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম এই বীর যোদ্ধা তার পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে ছিলেন একজন আদর্শ চরিত্রের অধিকারী যুবক। রাজনৈতিক কারণে ভিন্ন দল করায় তার পরিবারকে সাঈদ কমিশনারের পক্ষ থেকে নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হয়। পুলিশও বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানি করত। তাই মামুন তার বাসায় স্বাভাবিকভাবে কখনো ঘুমাতে পারেননি।

এরই মধ্যে মামুনের পরিবারে আসে নতুন খুশির বার্তা-একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানের আগমনে মামুন এবং তার পরিবারে নতুন আনন্দের জোয়ার বইতে থাকে। কিন্তু সেই খুশির মাঝেই দেশজুড়ে শুরু হয় কোটাবিরোধী আন্দোলন। মামুন এবং তার বড় ভাই সেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিদিন তারা একসাথে আন্দোলনের কর্মসূচিতে যোগ দিতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, এই আন্দোলন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।

অথচ মামুনের পরিবার ছিল খুবই সাধারণ এক পরিবার। বাবা আইনুল হক, বয়স ৬৫, সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। মাসিক আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা, যা দিয়ে পরিবারটি কষ্টে সংসার চালাত। তার মা মোকছেদা বেগম, বয়স ৫০, একজন গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলাতেন। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও মামুন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পড়াশোনার পাশাপাশি মামুন যতটা পারতেন বাবা-মাকে সাহায্য করতেন।

৫ আগস্ট, ২০২৪ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মামুন অংশ নেন বিজয় মিছিলে, যা একসময় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি মোড়ে এসে পৌঁছায়। স্থানীয় সাঈদ কমিশনার আন্দোলনকারীদের বসার জন্য তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। আন্দোলনকারীরা ভাবলেন, হয়তো কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দিতে চান তিনি। কিন্তু এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এক চক্রান্ত। সাঈদ কমিশনার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা ঘরে আগে থেকে গ্যাস সিলিন্ডার এবং পেট্রোল রেখে ফাঁদ তৈরি করে। তারা ভেতরে এলেই আগুন ধরিয়ে দেয়। আন্দোলনকারীরা দগ্ধ হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। এলাকাবাসী খবর পেয়ে দ্রুত আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে।

পথিমধ্যে ওই দিনই একজন মারা যান। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আরো একজনের মৃত্যু হয়। আল মামুনকে ঠাকুরগাঁও থেকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কিন্তু ৬ আগস্ট, ভোর ৬টায় শ্যামলীর কাছে মামুন তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। শেষমেশ এই বীর শহীদ মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। মামুনের নির্মম মৃত্যু শুধু তার পরিবার নয়, পুরো এলাকাবাসীকে গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। এমন নৃশংস এবং পৈশাচিক মৃত্যুতে এলাকাবাসী সাঈদ কমিশনার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

মামুনের মেয়েটি এখনো আব্বু আব্বু বলে তার বাবাকে খোঁজে। দুধের এ শিশুটি বুঝতেই পারেনি তার বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না। কারো কোনো সমস্যার কথা শুনলে মামুন সবার আগে দৌড়ে যেত তার সমস্যা সমাধান করতে। আর আজ তার মেয়েকে কেউ দেখার নেই। মামুনের পরিবারের দারিদ্রের কাহিনী অত্যন্ত বেদনাদায়ক। শহীদ আল মামুনের পিতা যিনি দীর্ঘদিন ধরে সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেয়ার ব্যবসার মাধ্যমে সংসারে খরচ চালিয়ে আসছেন, বর্তমানে কঠিন শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন। মামুনের বড় ভাই টিউশন করে কোনোরকমে সংসারের চাহিদা কিছুটা হলেও মেটাচ্ছেন। মা ডায়াবেটিসে ভুগছেন; চিকিৎসা খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শহীদ আল মামুনের মর্মান্তিক মৃত্যু তাদের জীবনের এই দুঃখ-কষ্টকে আরো গভীর করেছে এবং এই কঠিন পরিস্থিতিতে পরিবারটি ধীরে ধীরে আরো সঙ্কটে পড়ছে।