জ্বালানি নিয়ে সংসদে উত্তাপ
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে গতকাল উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় সংসদে। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সঙ্কট না থাকার কথা বলা হলেও তা বাস্তব সম্মত নয় বলে দাবি করেছেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রশ্ন রেখেছেন জ্বালানি সঙ্কট না থাকলে তাহলে পাম্পের সামনে লম্বা লাইন কেন?
গতকাল সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য তিন কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। সরকারের যদি কোনো সঙ্কটই না থাকে তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?
রুমিন ফরাহানার এ বক্তব্যের সময় সরকার দলীয় পক্ষ থেকে হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় রুমিন ফারহানার মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে এ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানও সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের আচারণ নিয়ে সমালোচনা করেন।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় বিএনপির এমপিদের হট্টগোল : নিন্দা জানালেন বিরোধীদলীয় নেতা
জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য চলাকালে ট্রেজারি বেঞ্চ (সরকার দলীয়) থেকে হট্টগোল ও নানা অঙ্গভঙ্গির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের কিছু সদস্যের অশালীন অঙ্গভঙ্গি তার বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
গতকাল রোববার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে এমন ঘটনা ঘটে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
অধিবেশনে একাত্তর বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের সঙ্কট নিয়ে ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জ্বালানি পরিস্থিতির প্রকৃত তথ্য সংসদে তুলে ধরার দাবি জানিয়ে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছে না। সরকারের যদি কোনো সঙ্কটই না থাকে, তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার মার্কেট প্লেস রাত ৮টার পরিবর্তে ৭টায় বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অদূরদর্শী। মানুষ কেনাকাটা সাধারণত সন্ধ্যার পরেই করে। এ ছাড়া অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারের মন্ত্রীরা গণমাধ্যমে সঙ্কট নেই বলে যে দাবি করছেন, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, আমি এই সংসদের মাধ্যমে জানতে চাই, বর্তমানে দেশে অকটেন ও ডিজেলের প্রকৃত মজুদ কত দিনের আছে? পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল কেন সরবরাহ করা হচ্ছে না? তেলের মজুদদারি কারা করছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা পরিষ্কার করতে হবে।
রুমিন ফারহানার বক্তব্য চলাকালে সরকার দলের সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন। তারা নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন। তার মধ্যেই বক্তৃতা দিতে থাকেন তিনি। তবে, বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই মাইক বন্ধ হয়ে যায়।
পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা-এর বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের কিছু সদস্যের অশালীন অঙ্গভঙ্গি তার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, সংসদের শুরুতেই একটি ইতিবাচক ও শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বারবার আহ্বান জানানোর পরও এ ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এর নিন্দা জানান। পাশাপাশি সংসদে কথা বলার ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলেও, বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার সংসদের সব সদস্যকে শিষ্টাচার বজায় রেখে কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম নতুন সদস্যদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদে প্রায় ২২০ জন নতুন সদস্য রয়েছেন, যারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী। কিন্তু অনেক সদস্য বারবার সুযোগ পেলেও, কেউ কেউ একবারও কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না।
চিফ হুইপ স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যারা আগে নোটিশ দেবেন তাদের বক্তব্য যেন সিরিয়াল অনুযায়ী তালিকাভুক্ত হয়। এ পদ্ধতি কিছু দিন অনুসরণ করা হলে নতুন সদস্যরা উৎসাহ পাবেন এবং সংসদের কার্যক্রম আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
বিদ্যুৎ না থাকায় এসএসসি পরীক্ষার্থীরা হায় হায় করছে : সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় এসএসসি পরিক্ষার্থীরা হায় হায় করছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনযোগ আর্কষণ করে আইয়ুবী এ কথা বলেন। সংসদে লোড শেডিংয়ের দুর্ভোগ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, গাজীপুর কাপাসিয়ায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় এসএসসি পরীক্ষার্থীরা হায় হায় করছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে চার দিকে যে সঙ্কট চলছে এটা উত্তোরণে আশু ব্যবস্থা না করলে সংশ্লিষ্টরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব সমস্যা দ্রুত নিরসনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রীরকে অনুরোধ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এই সংসদের বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটায় দুর্নীতি হয়েছে। যা চার হাজার টাকার পণ্য ২১ হাজার কোটি টাকায় কেনা হয়েছে। এমন দুর্নীতি বিগত সময়ে হয়েছিল।
দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সঙ্কট নেই : জ্বালানিমন্ত্রী
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সঙ্কট নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে সঙ্কট নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেয়া হচ্ছে না এবং মোটরসাইকেলে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে পুনরায় তেল নেয়া প্রতিরোধ করা হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সংসদ সদস্য যথার্থই বলেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো সঙ্কট নেই। গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চ মাসেও সমপরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে এই কৃত্রিম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জনমনে ভীতি ও অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করছে। একইসাথে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পাম্পে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেয়া বা রঙ লাগানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃত্রিম সঙ্কট নিরসনে ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
কুইক রেন্টালের লুটপাটের টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল প্রকল্পের নামে লুটপাট ও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে বলেও জানান তিনি। গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো: শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের (পাবনা-৫) এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। রোববারের প্রশ্ন উত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ জারি করা হয়েছিল। এই আইনের আওতায় কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা ক্রয় প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অযাচিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
তিনি আরো বলেন, এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিদ্যুতের অন্যায্য মূল্য এবং অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হতো। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও জড়িত ছিলেন। এতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিতর্কিত ওই বিশেষ বিধান আইনটি বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। ওই অধ্যাদেশটি গত ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মহান জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে। এর ফলে আগের মতো স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। মন্ত্রী আরো জানান, লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
দেশে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব : দেশে মজুদ থাকা গ্যাস দিয়ে আগামী ১২ বছর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোশারফ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুদ ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট গ্যাসের পরিমাণ ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, যদি নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হয় এবং বর্তমান হারে (দৈনিক প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তবে এই অবশিষ্ট মজুদ দিয়ে প্রায় ১২ বছর পর্যন্ত সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি জানান, পেট্রোবাংলার কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের মহাপরিকল্পনার আওতায় মোট ৫০ ও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৬টি কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কূপগুলোর কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান আছে।
এলপিজির কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকাতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে : ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এবং বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সঙ্কট যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্ন উত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো: শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে জ্বালানি মন্ত্রী এ কথা জানান। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এবং বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সঙ্কট যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নি¤œ লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ হতে জেলা প্রশাসনকে মাঠ পর্যায়ে মোবাইল কোর্টসহ প্রয়োজনীয় বিধি মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং পুলিশ সুপারদেরকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয়া হয়েছে। একইসাথে ভোক্তা পর্যায়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির জন্য এলপিজি অপারেটরদের সাথে সমন্বয়পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ সব ব্যবস্থা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে মজুদদারির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আরোপসহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের এলপিজির বাজার প্রায় ৯৮.৬৭% ভাগ আমদানি নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এলপিজির আমদানি পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে মনিটর করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে নিয়মিত দেশে এলপিজির আমদানি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে সে বিষয়ে আমদানিকারকদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাছাড়া, ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিইআরসিকে জানানো হচ্ছে।
তদারকি সত্ত্বেও অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়নি : মাঠ পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা সত্ত্বেও অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে সরকারের কার্যক্রম এবং নিবিড় তদারকির ফলে দেশে অবৈধ বিদ্যুতের ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে বলেও তিনি জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্ন উত্তর পর্বে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে জ্বালানি মন্ত্রী এ কথা জানান। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধে আওতাধীন বিতরণকারী সংস্থা, কোম্পানিগুলো কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা সত্ত্বেও অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সরকারের নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ এবং নিয়মিত নিবিড় তদারকি কার্যক্রমের ফলে দেশে অবৈধভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার, বিদ্যুতের অপচয় ও অপব্যবহার বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার, মিটার টেম্পারিং, মিটার বাইপাস, হকিং ইত্যাদির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং নিজস্ব জনবল দ্বারা ঝটিকা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ অবৈধ ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
সব ইউরিয়া সার কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না-শিল্পমন্ত্রী : বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সঙ্কটের কারণে সারের উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে সরকার সাত লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। লিখিত জবাবে শিল্পমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিশ্বে চলমান বিভিন্ন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সবকটি ইউরিয়া সার কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বর্তমানে কেবল ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি উৎপাদনে রয়েছে। এই উৎপাদন ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সাবিক (ঝঅইওঈ) থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফার্টিগ্লোব (ঋবৎঃরমষড়নব) থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কোটেশন পদ্ধতির মাধ্যমে আরো চার লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।