অপহরণ মুক্তিপণের মধ্যেই চলছে বনজীবীদের জীবনযুদ্ধ

দেড় বছরে আটক ৬১ ডাকাত, ৮০ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার; ডাকাতদের টার্গেট পর্যটকরাও

Printed Edition

এরশাদ আলী খুলনা ব্যুরো

সুন্দরবনের জলে-জঙ্গলে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুদের তৎপরতা। ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ ঘোষণার মাত্র ছয় বছর পার হলেও এখনো প্রায় নিয়মিত জেলে-বাওয়ালীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে ডাকাতরা। কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ মাঝেমধ্যে অস্ত্রসহ ডাকাত গ্রেফতার ও জেলেদের উদ্ধারের খবর দিলেও, বনজীবীদের পেটের দায়ে বনে গমন এবং ডাকাতদের তৎপরতা কোনো কিছুই কমছে না।

জানা যায়, সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করতে ২০১২ সালে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগকে নিয়ে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। ২০১৫ সালের ৩০ মে ‘মাস্টার বাহিনী’ আত্মসমর্পণ করে। ২০১৬ সালে আইয়ুব, রেজা ও বড় ভাই বাহিনীসহ ১২টি দল সক্রিয় ছিল। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ২৪৬টি যৌথ অভিযান চালানো হয়, যাতে র‌্যাবের ২৮ সদস্য প্রাণ হারান। গ্রেফতার হয় ৫৮৬ ডাকাত।

২০১৮ সালে ‘সুন্দরবনের হাসি’ প্রকল্পের আওতায় আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের এক লাখ টাকা ও সেলাই, ড্রাইভিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৬ সালের মে থেকে চলা এই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর- জুম প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তিন হাজার ৩২১টি অস্ত্র জমা দিয়ে ছয় বাহিনীর ৫৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করলে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়।

তখন গণমাধ্যমে সরকারের প্রশংসায় ভাসছিল এ ধরণের প্রতিবেদন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম। আত্মসমর্পণের পরও ডাকাতরা নগদ অর্থ ও ‘ক্যাশ অ্যান্ড কাইন্ড’ পেতে থাকে। তাদের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে অনেকেই বনে না গিয়েও টাকা আদায়ের সুযোগ পায়।

২০২৪ সালের আগস্টের পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পলায়নের সাথে সাথে আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের বনে ফিরে আসা ছাড়া গতি ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বন বিভাগের এক কর্মকর্তা। পুরনো আত্মসমর্পণকারীদের সাথে নতুন বাহিনী মিলে এখন সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ২০টি দস্যুদল।

এ সময়ে মাছ ধরতে গিয়ে তিন শতাধিক জেলে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে শতাধিক জেলের অপহরণ ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। প্রায় সবাই গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসেন ডাকাতদের কবল থেকে।

কোস্টগার্ড মোংলা পশ্চিম জোনের মিডিয়া ইনচার্জ লে. কমান্ডার মাহবুব জানান, গত দেড় বছরে বিভিন্ন দলের করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ ৬১ ডাকাতকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৯৯ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এ সময়ে অপহৃত ৭৮ জেলে ও তিন পর্যটককে জীবন্ত উদ্ধার করা হয়। বন বিভাগও পৃথক অভিযানে অস্ত্রসহ বেশ কয়েকজন ডাকাত গ্রেফতার করে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্যের পরও বনে টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন বনরক্ষীরা। এক ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন, ‘ডাকাতরা এখন অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। বনকর্মীদের হাতে লাঠি আর দা। গুলি চালানোর আইনি ঝক্কি আর পাঁচ লাখ টাকা খরচের ভয়ে কেউ এখন আর ডাকাতদের সমনে এগোতে চান না।’

আরেক কর্মকর্তা জানান, দুবলার চর বনের জন্য ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠেছে। সেখানে জেলেদের জন্য নির্মিত তিনটি সাইক্লোন শেল্টারে প্রভাবশালীরা অবস্থান করেন, যাদের বিরুদ্ধে ডাকাতদের আশ্রয় ও মুক্তিপণ আদায়ে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান জানান, ‘দস্যু দমনে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পুলিশ কাজ করছে। বন প্রতিমন্ত্রী খুলনায় সবাইকে নিয়ে সভা করে নির্দেশনাও দিয়েছেন।’

পর্যটক অপহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে ডাকাতরা পর্যটকদের বিরক্ত করত না, কিন্তু এবার একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে ওই পর্যটক বনের পাশে অনুমতিহীন কটেজে অবস্থান করছিলেন এবং বন বিভাগের অনুমতি বা গার্ড ছাড়াই বনে প্রবেশ করেছিলেন।’

সুন্দরবনের জলে এখন জেলেদের ভয়, ডাকাতের চোখের নজরদারী আর মুক্তিপণের হিসেব-নিকেশ সব মিলিয়ে প্রশাসনের জবাবদিহির অপেক্ষায় দিন গুনছেন বনজীবী মৌয়াল আর জেলেরা।