ইরান যুদ্ধের আড়ালে লাভবান কারা?

বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে থাকলেও অপ্রতিরোধ্য অস্ত্র ব্যবসা ও এআইসহ বেশ কিছু খাত

Printed Edition

আলজাজিরা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতের প্রভাবে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে। তবে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের আবহেও মুনাফার পাহাড় গড়ছে নির্দিষ্ট কিছু খাত। ওয়াল স্ট্রিট, প্রতিরক্ষা শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং গ্রিন এনার্জি- এই চার খাতের জন্য যুদ্ধ যেন নিয়ে এসেছে আশীর্বাদ।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে তেল, গ্যাস ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না। আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। কিন্তু এই সঙ্কটেও কিছু গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিটের ‘ব্যবসায়িক চমক’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অস্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘টাকো ট্রেড’ (ঞঅঈঙ ঃৎধফব - ঞৎঁসঢ় অষধিুং ঈযরপশবহং ঙঁঃ) প্রেসিডেন্টের ঘনঘন সিদ্ধান্ত বদলের ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও তা বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর জন্য লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঘনঘন তাদের শেয়ার কেনাবেচা করছেন, যার ফলে ব্যাংকগুলোর কমিশন ও রেভিনিউ বাড়ছে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের হিসেবে মরগান স্ট্যানলি ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৫.৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং গোল্ডম্যান স্যাকস ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৫.৬৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। জেপি মরগান চেজের আয়ও ১৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.৪৯ বিলিয়ন ডলারে।

বাজি ধরার রমরমা বাজার

প্রথাগত ব্যাংকের পাশাপাশি ‘পলি-মার্কেট’-এর মতো ক্রিপ্টো-ভিত্তিক প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্মগুলো এখন তুঙ্গে। এসব প্ল্যাটফর্মে যুদ্ধের ফলাফল বা বড় কোনো ঘটনার ওপর বাজি ধরা হচ্ছে। এপ্রিল মাস থেকেই পলি-মার্কেট প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডলার আয় করছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা তাদের ফি-র কাঠামো পুনর্গঠন করায় মুনাফার পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বা গোপন তথ্য ব্যবহার করে বাজি ধরার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জয়জয়কার

ইউক্রেন, ইরান, গাজা ও লেবাননের সঙ্ঘাত বিশ্বজুড়ে সামরিক বাজেট বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশ গত পাঁচ বছরে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ন্যাটো দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে মিসাইল থেকে শুরু করে ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য যাত্রা

যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অগ্রযাত্রা থামেনি। সেমিকন্ডাক্টর চিপের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে চিপ উৎপাদনকারী দেশগুলো। তাইওয়ানের চিপ জায়ান্ট ‘টিএসএমসি’ ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ১৮.১ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে। এমনকি ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই বছরেই শেয়ার বাজারে প্রবেশের (আইপিও) পরিকল্পনা করছে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় ‘গ্রিন এনার্জি’

হরমুজ প্রণালী দিয়ে এশিয়ার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমান অবরোধের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে। এই সঙ্কটই তাদের নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। সৌরশক্তি এবং পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সরকারি প্রণোদনার ফলে ক্লিন এনার্জি ইনডেক্স ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিশেষে, ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিলেও যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রযুক্তি এবং অস্থির পুঁজিবাজার কিছু নির্দিষ্ট খাতের জন্য স্বর্ণযুগ তৈরি করেছে। তবে এই ‘মুনাফা’ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিনিময়ে অর্জিত হচ্ছে।