রাজস্বে বড় ধাক্কা : ৯ মাসে রেকর্ড ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

কর সংস্কার ও রাজস্ব বাড়াতে জোর দিচ্ছে সরকার

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতিতে শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত করে মার্চ মাসে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে এযাবৎকালের রেকর্ড ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মন্থর গতিকে দায়ী করছেন।

এনবিআরের সাময়িক তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগের বছরের মার্চের তুলনায় এ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২.৬৭ শতাংশ, যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। অর্থবছরের বাকি তিন মাসের প্রবণতা বিবেচনায় নিলে মোট ঘাটতি সোয়া এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খাতভিত্তিক আদায়ের হালচাল এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমদানি খাত। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হওয়ার বদলে উল্টো আদায় কমেছে। অন্য দিকে ভ্যাট ও আয়কর খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নগণ্য।

ি ভ্যাট আদায় : প্রবৃদ্ধি ৪.৮৬ শতাংশ।

ি আয়কর আদায় : প্রবৃদ্ধি ২.৭৭ শতাংশ।

ি আমদানি কর : ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি (আগের বছরের তুলনায় কমেছে)।

বিশাল ঘাটতির নেপথ্যে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এত প্রবৃদ্ধির পরও কেন রেকর্ড ঘাটতি? অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো বাস্তবতাবিবর্জিত ও মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ডলার সঙ্কট ও এলসি খোলার জটিলতায় আমদানি কমে যাওয়া এবং বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ভ্যাট ও আয়কর আদায়ের গতি থমকে গেছে।

ভবিষ্যৎ শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি রাজস্ব ঘাটতি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

কর সংস্কার ও রাজস্ব বাড়াতে জোর দিচ্ছে সরকার

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে করকাঠামো সংস্কার এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, রাজস্ব ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় এবার বাজেটে বাস্তবভিত্তিক ও কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং কর ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঘাটতি পূরণে কর সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। বিশেষ করে ভ্যাট ও আয়কর খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এ দিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি, যা সরকারি ব্যয় মেটাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথেও করা চুক্তির অংশ হিসেবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

বাজেট প্রস্তাবে কর অব্যাহতি (ট্রাক্স এক্সজামশন) ধীরে ধীরে কমানো, ভ্যাট কাঠামো সহজ করা এবং একক হারে ভ্যাট প্রয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে। একই সাথে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ দিকে অর্থনীতির বর্তমান চাপও রাজস্ব আহরণে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতির কারণে কর আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ছে না এবং ব্যবসা খাতের দুর্বলতা রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বড় বাধা।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, কর সংস্কার সফল করতে হলে শুধু করহার বাড়ানো নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, করদাতাদের আস্থা তৈরি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাক্সিক্ষত রাজস্ব অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, আসন্ন বাজেটে কর সংস্কারকে কেন্দ্র করে রাজস্ব বৃদ্ধির একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আসবে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এনবিআর সূত্র জানা যায়, আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। এদিকে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনবিআর তার লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে এনবিআর ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্ব আদায় করেছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে আরো বাড়তি ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকার নতুন লক্ষ্যমাত্রা আসছে এনবিআরের। বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এরই মধ্যে রাজস্ব অব্যাহতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।