ঢাকা শহরে ‘জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল’
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ টেকনিক্যাল কমিটির
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা শহরে জিরো সিগন্যাল এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমের ১০৫ কিলোমিটার রাস্তার কানেকটিভিটি তৈরির চিন্তাভাবনা করছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে যানজট নিরসনে ‘জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল’ নামের একটি প্রকল্পের সম্ভব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল কমিটি। গতকাল রোববার সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল টেকনিক্যাল উপকমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত সভায় সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেলের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রাজউক, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের সাথে সভা করে গৃহীত অগ্রগতিগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়।
এরপর গত ১২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সিনিয়র সচিব) মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার (যুগ্মসচিব) মো: আবদুল্লাহ হাক্কানীসহ স্থানীয় সরকার, পুলিশ অধিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১০ সদস্যের ইনোভেশন টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইনোভেশন টিম কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট মডেল’ বিষয়ে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে মতামত প্রদান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট মডেল’ এর বাস্তবায়ন বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত প্রদানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (প্রশাসন ও অর্থ অনুবিভাগ) আহ্বায়ক, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পুলিশ অধিদফতর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, নগর উন্নয়ন অধিদফতর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চিফ ইনোভেশন অফিসার মো: আবদুল্লাহ হাক্কানী। এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সভা গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেয় টেকনিক্যাল কমিটি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ইন্টার সেকশন সিগন্যাল বসাতে হবে ৮০টি এবং ৪৩টি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এর মধ্যে ছয়টি অবকাঠামো বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং বাকি ৩৭টি অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। অবশ্য আপাতত ৩০টি অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলেই চালু করা যাবে স্বপ্নের সেই কানেকটিভিটি।
অবকাঠামোর স্থানগুলো হচ্ছে- নিমতলী বাসস্ট্যান্ড, হজরত গোলাপশাহ মোড়, কাকরাইল, শান্তিনগর, রামপুরা টিভি, নতুন বাজার, আজমপুর, জমজম টাওয়ার, ময়লার মোড়, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর-১০, সনি সার্কেল, বাংলা কলেজ, টেকনিক্যাল মোড়, আড়ংমোড়, সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত মোড়, পলাশী মোড়, শহীদ মিনার, শিক্ষা ভবন-হাইকোর্ট মোড়, মৎস্যভবন, কাকরাইল, তেজগাঁও সাউথ, তেজগাঁও নর্থ, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, গুলশান লিংকরোড, মহাখালী রেলক্রসিং, বনানী সাউথ, বনানী নর্থ, আগারগাঁও বাসস্ট্যান্ড, জিয়া উদ্যান-উড়োজাহাজ চত্বর, বিজয় সরণি, কাওরানবাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ মোড়, আবুল হোটেল, দিয়াবাড়ি ও কাজিপাড়া।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১৯টি ওভারপাস/আন্ডারপাস। এর মধ্যে বর্তমানে তিনটি বিদ্যমান রয়েছে। ৮০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪২ ফুট প্রস্থের বাকি ১৬টি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আনুমানিক খরচ পড়বে ৮৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ওভারপাস ইউলুপ নির্মাণ করতে হবে ১৬টি। এর মধ্যে তিনটি বিদ্যমান রয়েছে। ১২০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের বাকি ১৩টি ইউলুপ নির্মাণে খরচ পড়বে ৬২৪ কোটি টাকা। ইউলুপসহ ওভারপাস ইন্টারচেঞ্জার একটি, যার নির্মাণখরচ পড়বে ১৫৩ কোটি। এসব অবকাঠামো খাতে সর্বমোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া নির্মাণ করতে হবে ৩০টি ফুট ওভারব্রিজ ও ৯টি ফ্লাইওভার। ফ্লাইওভার নির্মাণ খরচ আলাদাভাবে ধরতে হবে। তবে ৩০টি ফুট ওভারব্রিজের আনুমানিক নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত ১০৫ কিলোমিটার জিরো সিগন্যাল এক্সপ্রেসওয়ের বাইরে রাজধানীর বাকি অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোকে অটোমেটেড ট্রাফিক লাইট ও সিগন্যালের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রস্তাবনাও রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে তিন মাসের মধ্যে এআইভিত্তিক ট্রাফিক লাইট ও সিগন্যাল অটোমেশন করা। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট চালু করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে ঢাকা মহানগরের ভেতরে থাকা আন্তঃজেলা বাসটার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা ও শহরের চারপাশে নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা। সিটি সার্ভিস চালু করা, শহরের অভ্যন্তরে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করা, দিনের বেলায় কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখা এবং ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) চালু করা।