প্রশ্নের মুখে ঢাবির স্বাস্থ্যবীমা

প্রিমিয়াম দিচ্ছেন শিার্থীরা মিলছে না প্রাপ্য

স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে শুরুতে বেশ আশাবাদ তৈরি হলেও বর্তমানে নানা জটিলতা সামনে আসছে

Printed Edition

হারুন ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিার্থীর কাছে ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর দিনটি জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। সেদিন একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। দুর্ঘটনার পর তাকে দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস পায়ে রড বসানো অবস্থায় থাকতে হয়েছে। এই সময়টা ছিল অসহ্য ব্যথা, নিয়মিত চিকিৎসা, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। ধীরে ধীরে বন্ধুদের সহায়তা, পরিবারের পাশে থাকা এবং চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন।

২০২৫ সালের আগস্টে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাকে জানানো হয়, এক অর্থবছরের চিকিৎসা ব্যয় অন্য অর্থবছরে দাবি করা যাবে না। বিষয়টি তাকে ভীষণভাবে হতাশ করে। তার ভাষায়, তখন তার কাছে বেঁচে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এত দীর্ঘ ভোগান্তির পরও যদি বীমার সুবিধা না পাওয়া যায়, তাহলে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।

উক্ত ছাত্রের একই ধরনের অভিযোগ আরো অনেক শিার্থীর কাছ থেকে পাওয়া গেছে। কয়েক বছর আগে চালু হওয়া এই স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পটি নিয়ে শুরুতে বেশ আশাবাদ তৈরি হলেও বর্তমানে নানা জটিলতা সামনে আসছে। প্রশাসনিক ধীরগতি, বীমা কোম্পানির গড়িমসি এবং সময়মতো কেইম না পাওয়ার কারণে শিার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকের মতে, প্রয়োজনের সময় যদি এই বীমা থেকে কোনো সহায়তা না মেলে, তাহলে এটি বাস্তবে খুব একটা কাজে আসে না।

জানা যায়, ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত সব শিার্থীর জন্য স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা বাধ্যতামূলক করে। শুরুতে ভর্তি হওয়ার সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে শিার্থীরা এই সুবিধার আওতায় আসতেন। তখন বলা হয়েছিল, তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যাবে। তবে বয়স ২৮ বছরের বেশি হলে বা শিার্থী হিসেবে সম্পর্ক শেষ হলে এই সুবিধা আর প্রযোজ্য হবে না।

এরও আগে, ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো এই বীমা কার্যক্রম চালু করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদের উদ্যোগে পরীামূলকভাবে ওই ইনস্টিটিউটের শিার্থীদের জন্য এটি চালু করা হয়েছিল। পরে এর সুফল দেখে অন্যান্য বিভাগেও চালু করা হয় এবং ধীরে ধীরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়।

বর্তমানে এই স্বাস্থ্যবীমা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। এখন প্রত্যেক শিার্থীকে প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে ৩৩০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বীমা সুবিধা পাওয়ার কথা। এই সুবিধার মধ্যে কেবিন বা ওয়ার্ড ভাড়া, হাসপাতালের সেবা, অস্ত্রোপচার খরচ, চিকিৎসকের ফি, ওষুধ ও বিভিন্ন পরীার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেয়ার নিয়ম আছে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়, যেখানে পরীা-নিরীা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফিও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি প্রেসক্রিপশনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি হিসেবে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দেয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে কাগজে-কলমে এত সুবিধা থাকলেও বাস্তবে শিার্থীরা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই জানিয়েছেন, বীমার টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, যে পরিমাণ টাকা দেয়া হয় তা চিকিৎসার ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম।

ইশরাত জাহান নামে এক শিার্থী জানান, তিনি তিনবার কেইম করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনোবারই সন্তোষজনক ফল পাননি। প্রথমবার তার আবেদন সরাসরি বাতিল করা হয়। দ্বিতীয়বার জমা দেয়া কাগজপত্র খুঁজেই পাওয়া যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রোফাইল সংক্রান্ত কোনো তথ্যই বিভাগ বা প্রশাসনিক ভবনে পাওয়া যায়নি। সবাই একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। তৃতীয়বার জমা দেয়া আবেদনটি এক বছর ধরে ‘প্রসেসিং’ অবস্থায় রয়েছে বলেও তিনি জানান।

অন্য দিকে জয়ন্ত রায় নামে এক শিার্থী বলেন, চিকিৎসার জন্য তার প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার পরও তিনি মাত্র এক হাজার টাকা পেয়েছেন। তার প্রশ্ন, প্রিমিয়াম নেয়ার সময় কোনো ছাড় না থাকলেও টাকা দেয়ার সময় এত কাটছাঁট কেন করা হয়?

জে এইচ ইমন নামে আরেক শিার্থী জানান, তিনি পাঁচ মাস আগে কেইম জমা দিয়েছেন, কিন্তু এখনো কোনো আপডেট পাননি। বীমা কোম্পানির প থেকে তাকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ না করায় তারা শিার্থীদের টাকা দিতে পারছে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী হিসাব পরিচালক (স্বাস্থ্য বীমা) মো: ছানোয়ার হোসেন বলেন, শুরুতে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ভালো সাড়া দিলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। তিনি জানান, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর কোম্পানির চারজন পরিচালকের মধ্যে তিনজন কারাগারে চলে যান। এর পর থেকেই তারা বীমার টাকা পরিশোধে অনিয়ম করতে শুরু করে।

তিনি আরো বলেন, কোম্পানিটি ঠিকমতো টাকা পরিশোধ না করায় ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রিমিয়াম দেয়া বন্ধ করে দেয়। পরে কোম্পানির প থেকে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব বকেয়া কেইম পরিশোধ করা হবে। কিন্তু এখনো সেই প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়ন হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কী পদপে নিচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি জানান, বীমা কোম্পানির সাথে একটি বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।

ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পর্যাপ্ত রিজার্ভ অর্থ নেই। কোনো বীমা কোম্পানির রিজার্ভ না থাকলে তারা নিয়মিত কেইম পরিশোধ করতে পারে না। এই তথ্য জানা থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত বছর তাদের সাথে চুক্তি নবায়ন করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরো বলেন, বীমা কোম্পানি শিার্থীদের যথাযথ সুবিধা না দিলেও কিছু শিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। এই কারণেই রিজার্ভ না থাকা সত্ত্বেও তাদের সাথে চুক্তি নবায়নে ভূমিকা রাখা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

স্বাস্থ্যবীমা কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনে আনার বিষয়ে ডাকসুর উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বীমা কোম্পানি শিার্থীদের তথ্য চাইলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেল এখনো তা সরবরাহ করতে পারেনি, ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এক নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে অফিসে ফোন করলে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাদের চুক্তি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্য অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে যে কোম্পানির সাথে চুক্তি রয়েছে, তারা কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। এ কারণে তাদের প্রিমিয়াম দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে শিার্থীরা সাময়িক সমস্যায় পড়লেও শিগগিরই নতুন বীমা কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অন্য দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. এ বি এম ওবাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টির বিস্তারিত এখনো জানেন না। তবে যেহেতু সমস্যার বিষয়টি সামনে এসেছে, তাই এটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।