জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে
ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন কৌশল
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের জ্বালানি খাতে চলমান সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার একাধিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরবরাহ বৃদ্ধি, বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং ডিজিটাল নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে সঙ্কট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ইতোমধ্যে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জ্বালানির সঙ্কটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরও সরবরাহ সঙ্কট কমেনি- এমন বাস্তবতায় অতিরিক্ত তেল ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশরনর (বিপিসি) অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী দৈনিক ১৩ হাজার ৪৮ মেট্রিক টন ডিজেল, এক হাজার ৪২২ মেট্রিক টন অকটেন এবং এক হাজার ৫১১ মেট্রিক টন পেট্রল বাজারে সরবরাহ করা হবে। ডিজেলের বড় অংশ মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড পাবে, এরপর পদ্মা অয়েল কোম্পানি ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। অকটেন ও পেট্রলেও প্রায় একই অনুপাতে বণ্টন করা হয়েছে, যাতে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং খুচরা পর্যায়ে সঙ্কট কমানো। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য উভয়ই অস্থির হয়ে উঠেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে। এই সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার শুধু সরবরাহ বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছে। মোটরসাইকেলের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা তারই একটি অংশ। কিউআর কোডভিত্তিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্বালানি ক্রয়-বিক্রয়ে স্বচ্ছতা আনা এবং অপব্যবহার রোধ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় নতুন করে ১৯টি জেলায় নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, যশোর, দিনাজপুর এবং কুড়িগ্রামসহ আরো কয়েকটি জেলা। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ফুয়েল পাস মূলত একটি মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিবন্ধনের মাধ্যমে একটি কিউআর কোড পান। এই কোড স্ক্যান করে নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এর ফলে অতিরিক্ত মজুদ, কালোবাজারি এবং অনিয়ন্ত্রিত বিক্রির মতো সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে এটি ঢাকার তেজগাঁও ও আসাদ গেট এলাকার দু’টি পেট্রল পাম্পে চালু করা হয় এবং প্রথম ধাপে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। তবে জ্বালানি খাতের সঙ্কট শুধু তরল জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়; গ্যাস খাতেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায়।
তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সাথে আবাসিক গ্রাহকরাও রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানি খাতের এই সঙ্কট মূলত দীর্ঘ দিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। আমদানিনির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এই সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে শুধু স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা জরুরি।