কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকাতে জ্বালানিতে আসছে কিউআর নজরদারি

Printed Edition

- রাজধানীতে পরীক্ষামূলক ফুয়েল পাস অ্যাপ চালু

- ধরা পড়বে একই ব্যক্তি বারবার জ্বালানি নিলে

বিশেষ সংবাদদাতা

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কৃত্রিম সঙ্কট এবং অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের অভিযোগ ঠেকাতে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাচ্ছে সরকার। জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কিউআর কোডভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ ‘ফুয়েল পাস’ পরীামূলকভাবে চালু করেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। প্রাথমিকভাবে ঢাকার দু’টি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এই পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব ধরনের যানবাহনের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কে আয়োজিত নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে তৈরি এই অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানি বিতরণের কারণে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অনেক স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক েেত্র একই ব্যক্তি একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, যা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি নিয়ে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বা ‘প্যানিক বাইং’-এর কারণে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপকে একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি স্বতন্ত্র কিউআর কোড তৈরি হবে। ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেয়ার সময় সেই কোড স্ক্যান করলেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।

এই ব্যবস্থায় ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জ্বালানির বরাদ্দ ও বিতরণের তথ্য এন্ট্রি করবেন। চালকরা কিউআর কোড স্ক্যান করে জ্বালানি গ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের বরাদ্দও তাৎণিকভাবে দেখতে পারবেন। একই সাথে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণের অবস্থা রিয়েল-টাইমে পর্যবেণ করা সম্ভব হবে। জ্বালানি বিভাগ আরো জানিয়েছে, এ অ্যাপটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপরে (বিআরটিএ) কেন্দ্রীয় ডাটাবেসের সাথে সংযুক্ত থাকবে। ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং একই যানবাহনের নামে একাধিকবার জ্বালানি নেয়ার সুযোগ কমে আসবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

যাদের স্মার্টফোন নেই, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা নির্ধারিত ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে কিউআর কোড ডাউনলোড করতে পারবেন। চাইলে সেটি প্রিন্ট করে ব্যবহার করা যাবে।

ব্রিফিংয়ে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এই ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অটোমেশন এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এর ফলে সঙ্কটকালীন সময়েও কার্যকরভাবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা করা যাবে।’ একই ব্রিফিংয়ে অবৈধ জ্বালানি মজুদবিরোধী অভিযানের তথ্যও তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, ৮ এপ্রিল সারা দেশে ৩৬১টি অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৩৬২ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১৯২টি মামলা, দু’জনকে কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ ৭৯ হাজার ৫০ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত ৩ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে সাত হাজার ৩৪২টি অভিযান পরিচালনা করে চার লাখ ৬৯ হাজার ৪২ লিটার অবৈধভাবে মজুদকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে তিন হাজার ১১টি মামলা, ৩৬ জনকে কারাদণ্ড এবং এক কোটি ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

জ্বালানি মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেলের কোনো সঙ্কট নেই। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ৪৩ হাজার ১৪৩ মেট্রিকটন ডিজেল, ১৬ হাজার ৮১২ মেট্রিকটন পেট্রল এবং ৯ হাজার ৫৬৯ মেট্রিকটন অকটেন মজুদ রয়েছে। আগামী দুই মাসের জ্বালানি সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারের আশা, ‘ফুয়েল পাস’ কার্যক্রম সফল হলে এটি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে দীর্ঘ লাইন, অনিয়ম, অতিরিক্ত সংগ্রহ এবং কৃত্রিম সঙ্কটের মতো সমস্যাগুলো অনেকটাই কমে আসবে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতায় দ্রুত এই আধুনিক ব্যবস্থা দেশব্যাপী চালু করা সম্ভব হবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।