অসম্ভব বলে কিছু নেই : বুবিস্তা
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
আসল নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। ফুটবল বিশ্ব এখন তাকে চেনে ‘বুবিস্তা’ নামে। জন্ম বোয়া ভিস্তা দ্বীপে বলেই শৈশবের ডাকনাম ‘বুবিস্তা’। গতকাল সকালে হিউস্টনের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী মানুষটিই লিখলেন দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় ইতিহাস। তার হাত ধরেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে।
টানা সাতবার ব্যর্থ হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আফ্রিকান ব্লু শার্কসরা। আর প্রথমবার সুযোগ পেয়েই চমকে দিয়েছে তারা। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গ্রুপ থেকে অপরাজিত রানার্সআপ হয়ে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। বাইরে থেকে এটি রূপকথা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের পরিকল্পনা, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রম। এবার তাদের সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে শক্তির পার্থক্য নিয়ে ভীত নন কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা। দলটির কাছে অসম্ভব কিছু নেই বলে মনে করেন তিনি।
হিউস্টনে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে কেপ ভার্দে। আগামী ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মায়ামি স্টেডিয়ামে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে নামবে দলটি। নকআউট নিশ্চিতের পর দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা বুবিস্তা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের কাছে হারানোর কিছু নেই, অসম্ভব বলেও কিছু নেই। আমাদের দল যা করেছে, তা নিয়ে আমরা এবং কেপ ভার্দের মানুষ গর্বিত হওয়া উচিত।’
বিশ্বকাপ ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ কেপ ভার্দের জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম। দেশের অসংখ্য মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে দলের ম্যাচ দেখেছেন। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই ড্র করেছে কেপ ভার্দে। এর মধ্যে প্রথম ম্যাচে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে আলোচনায় আসে আফ্রিকানরা। কেপ ভার্দের এই সাফল্যের অন্যতম বড় ভিত্তি সেন্টার-ব্যাক লোগান কস্তা। ভিয়ারিয়ালের এই ডিফেন্ডার গত বছরের জুলাইয়ে এসিএল ইনজুরিতে পড়ে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। বিশ্বকাপের আগে গত ১৭ মে লা লিগায় মাত্র ১৩ মিনিট খেলেছিলেন। এমন একজন ফুটবলারকে দলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু বুবিস্তা বিশ্বাস হারাননি। সেটার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা সৌদি আরব- কেউ-ই সহজে ভাঙতে পারেনি কস্তাদের রক্ষণপ্রাচীর। পুরো গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের সংগঠিত রক্ষণভাগ। এভাবে একজন একজন করে পরীক্ষিত সৈনিককে দলে যুক্ত করেছেন বুবিস্তা।
কেভিন পিনার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ব্রকটনের রাস্তায় খেলতে খেলতেই সাবেক অধিনায়ক কার্লোস মোরাইসের চোখে পড়েছিলেন। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলে যাত্রা। এখন রাশিয়ার ক্রাসনোদারে খেলেন। বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে তার ফ্রিকিক গোল এখনও টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। আবার উরুগুয়ের বিপক্ষে বদলি নেমে সমতাসূচক গোল করা হেলিও ভারেলা খেলেন ইসরায়েলের ক্লাবে। ম্যাচের আগে হয়তো খুব কম মানুষই তার নাম জানত; কিন্তু একটি গোলই তাকে কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেয়া ডিফেন্ডার পিকো লোপেস প্রথমে ভেবেছিলেন, লিংকডইনে পর্তুগিজ ভাষায় আসা কেপ ভার্দে কোচের বার্তাটি বুঝি স্প্যাম! পরে বুঝতে পারেন- সেটিই ছিল জাতীয় দলের ডাক। বার্তাটি উপেক্ষা করলে ইতিহাসের অংশ হতেন না।
এবার সেই কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনা। তবে এটিকে শুধু একটি ম্যাচ হিসেবে দেখছেন না বুবিস্তা। লা আলবিসেলেস্তেদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়ে গর্বিত তিনি, ‘সবার আগে, আমরা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে পারব এটাই আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। অবশ্যই আমাদের দল, খেলোয়াড় এবং দেশের মানুষের জন্য এটি আনন্দের উপলক্ষ। শুরু থেকেই আমরা বলেছি, আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সামনে আমাদের দেশকে তুলে ধরা। এমন একটি পর্যায়ে আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলতে পারা আমাদের দেশের জন্য দারুণ ব্যাপার, ম্যাচের ফল যাই হোক না কেন। সবার বুঝতে হবে আমরা কার বিপক্ষে খেলছি।’
বুবিস্তার বিশ্বাস, কেপ ভার্দের এই সাফল্য শুধু তাদের দেশের জন্য নয়, বিশ্বের ছোট দেশগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। তবে আমরা আফ্রিকারও প্রতিনিধিত্ব করি। তার চেয়েও বড় কথা, আমরা বিশ্বের ছোট ছোট দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করি।’
দলের সাফল্যের রহস্যও জানালেন বুবিস্তা, ‘এটাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা প্রমাণ করেছি, লক্ষ্য স্থির রেখে নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করলে একসময় না একসময় কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।’