মুক্তিযুদ্ধ প্রকল্পে ব্যয় ৫ কোটি টাকা শিক্ষকের বেতন পিয়নের চেয়ে কম
Printed Edition
জাতি গঠনের মূল কারিগর শিক্ষকরা সব সময়েই অবহেলিত। আর্থিক সুরক্ষা আর সামাজিক নিরাপত্তায় শিক্ষকদের মর্যাদা এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে মেধাবী এবং যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধ প্রকল্পের নামে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করা হলেও শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয়েছে তারই অধীনস্থ পিয়নের চেয়েও কম। এই গ্লানি নিয়ে কর্মজীবন শেষ করেছেন অনেক শিক্ষক। এর প্রতিকারের জন্য স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে অতীতের অন্যায় আর দুর্নীতি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। অপর দিকে শিক্ষকদের এই অপমানজনক (আর্থিকভাবে কম) বেতন আর সামাজিক মর্যাদা হানির জন্য সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দুর্নীতিকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সাথে শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে তথা প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের প্রবেশ পর্যায়ে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ না হলে ৫ মে থেকে কর্মবিরত পালনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা। গতকাল শনিবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তারা দাবি আদায়ে আগামী ৪ মে পর্যন্ত সময়ও বেঁধে দিয়েছেন সরকারকে।
শিক্ষকদের কম বেতন প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, একজন শিক্ষককে যদি পিয়নের সমান বেতন দেয়া হয়, তাহলে তিনি কেন শিক্ষক হবেন? তার মতে এ জন্যই বর্তমানে আর মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষকতায় আসতে চান না। তবে এই সমস্যাগুলো দূর করতে হলে অবশ্যই সর্বজনগ্রাহ্য একটি শিক্ষানীতি সরকারকে প্রণয়ন করতে হবে। এ ছাড়াও শিক্ষা কমিশন করে অতীতের শিক্ষা সেক্টরের সব দুর্নীতি ও লুটপাটের শ্বেতপত্র প্রকাশের আহ্বান জানান এই শিক্ষাবিদ। সরকারের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, আপনার কারখানা যদি ভালো হয়, তাহলে আপনার প্রোডাক্টও ভালো হবে। মনে রাখতে হবে যোগ্য শিক্ষকরাই দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি করতে পারবেন। তা না হলে দেশ আরো ধ্বংসের পথে যাবে। আমরা যদি আমাদের নতুন প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারি, সে অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে পারি, তাহলে দেশের চেহারাই বদলে যাবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই যে ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ে এত টাকা খরচ করা হয়, এসব কিচ্ছু করার দরকার নাই। জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করেন। দেখবেন আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন করা যদি সম্ভব না- হয় তাহলে অন্তত একটি অস্থায়ী শিক্ষা কমিশন করেন। তারপর গত ১৬ বছরের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন দুর্নীতি ও লুটপাটের। তিনি বলেন, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কত কোটি টাকার বাজেট লুটপাট করেছে তা সামনে আনতে হবে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ প্রজেক্টের নাম করে সরকারের পাঁচ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। আর এভাবে আর্থিক লুটপাটের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এ দিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে নানাভাবে দাবি উঠে আসছে। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, কনসালটেশন কমিটির সুপারিশের যৌক্তিক সংস্কার করে সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পদ ধরে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন করতে হবে। প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতিসহ দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে।
মোর্চার নেতৃবৃন্দ বলছেন দাবি আদায় না হলে আগামী ৫ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হবে। এরপর দ্বিতীয় দফায় ১৬ থেকে ২০ মে দুই ঘণ্টা, তৃতীয় দফায় ২১ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে। এর মধ্যেও যদি দাবি আদায় না হয়, তাহলে আগামী ২৬ মে থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করবেন শিক্ষকরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত অক্টোবরে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কারে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি কমিটি সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেয়। এ বিষয়ে কমিটির এক সদস্য জানান, কমিটির পক্ষ থেকে সহকারী শিক্ষক পদ বিলুপ্ত করে এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষক পদে ১২তম গ্রেডে বেতন দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে দেয়া এবং পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।